কৌমুদী

কৌমুদী

অর্পিতা ঘোষ পালিত

– সারাদিন কিছু খাইনি মা, খুব খিদে পেয়েছে। দুটো টাকা দেবে, কিছু কিনে খাবো…

– সর, সর, একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। চুরি করার ধান্ধায় আছিস নাকি? এদের হাজার খাইয়েও পেট ভরেনা। একেবারে ছোট্ট থেকেই ট্রেনিং পেয়ে গেছিস দেখছি, যত্তসব…বলতে বলতে নিজেই জায়গা পরিবর্তন করলাম সাথের ব্যাগটাকে নিয়ে। মেয়েটার দিকে আর ফিরেও তাকালাম না।

মিনিট পাঁচেক পর আপ ট্রেনের এনাউন্স শুনে এগিয়ে গেলাম। বেশ ভালো ভিড় হয়েছে,  ট্রেনে উঠে কোনোরকমে একটু দাঁড়ানোর জায়গা পেলাম।

        তিনদিনের জন্য যাচ্ছি এক আত্মীয়ের বাড়ি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। কর্তামশাইয়ের কাজের দায়িত্ব বেশি থাকায় ছুটি নিতে পারেনি, অগত্যা একাই সফর করতে হচ্ছে।

        পরের স্টেশন আসতে কিছুটা ফাঁকা হলো, প্যাসেঞ্জার নেমে গেলে ট্রেন ছাড়ল। সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন, বোধহয় পরের স্টেশনে নামবেন। জায়গা পেয়ে বসে স্বস্তি পেলাম। সাইড ব্যাগটাকে ব্যাংকারে রাখার পর খেয়াল হলো হাত ব্যাগটার কথা। মোবাইল আর হাত ব্যাগটা সবসময় হাতেই রাখি, মোবাইল আছে অথচ হাত ব্যাগটা নেই। তন্নতন্ন করে খুঁজেও পাওয়া গেলনা। টাকাপয়সা যা কিছু সব ব্যাগেই ছিল। ভাগ্গিস গিফট দেওয়ার জন্য ছোট সোনার দুলদুটো সাইড ব্যাগে রেখেছিলাম, তা নাহলে ওটা শুদ্ধু হারাতো। এবার কি হবে, আত্মীয়ের বাড়ি স্টেশনের কাছেই তাই টোটো রিক্সা কিছু করতে হবে না। ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে চলে যাব।

বিয়ে বাড়ি যাচ্ছি বলে মনে আনন্দ ছিল, সেসব নিমেষে উধাও হয়ে গেল। মোবাইলে কর্তাকে হাতব্যাগ হারানোর কথা বললাম, প্রথমে একচোট বকা খেলাম তারপর ঠান্ডা হয়ে বললো- কি আর করা যাবে ওখানে গিয়ে ওদের কারোর ব্যাংকের একাউন্ট নাম্বার পাঠিয়ে দিও, সেখানে দুহাজার টাকা পাঠিয়ে দেবো। টাকাটা ব্যাংক থেকে তুলে দিতে বোলো।

       যাহোক করে সমস্যা মিটলো, কিন্তু মনটা খচখচ করছে…হাতব্যাগটা কোথায় ফেললাম, কেউ ছিনতাই করেনি তো…

       তিনদিন পর বাড়ি ফিরছি, ট্রেন থেকে স্টেশনে নেমে একটু এগোতেই ভিক্ষা চাওয়া বাচ্চা মেয়েটা আমার কাছে ছুটে এলো, একমুখ স্বর্গীয় হাসি নিয়ে।

– মা, মা… সেদিন তুমি ট্রেনে ওঠার সময় তোমার হাত থেকে এই ব্যাগটা পড়ে গ্যাছে। আমি কুড়িয়ে নিয়ে যত্ন করে রেখে দিয়েছি। সেদিন থেকে যত ট্রেন এসেছে সব ট্রেনে আমি খুঁজে দেখেছি তুমি নেমেছ কিনা, আজ তোমাকে পেলাম। নাও ম

       আমি আমার স্ট্যাটাস, পরিচয় সব ভুলে গেলাম। হাহাকার বুকে মা ডাক শুনে মন জুড়িয়ে গেল। যে ডাকের জন্য এতবছর অপেক্ষা করেছি, যে ডাক শোনার জন্য কত ডাক্তার দেখিয়েছি সে ডাক শোনাতে ঈশ্বর যে এই রূপ নিয়ে আমার মেয়ে হয়ে আসবে আমি চিনতে পারিনি।

ওকে জড়িয়ে ধরে ওখানেই বসে পড়লাম– তোর কে কে আছে রে?

– আমার তো কেউ নেই, আমি সিঁড়ির এক কোণে থাকি

– তুই এখানে এলি কি করে?

– কি জানি…মনে হয় ট্রেনে ভিক্ষা করতে করতে এসে পড়েছি।

-আমার বাড়ি যাবি? আমার কাছে আমার মেয়ে হয়ে থাকবি

–তোমার বাড়ি ? আমাকে নিয়ে গেলে তোমাকে কেউ কিছু বলবে না?

– তোকে কেউ যদি কিছু বলে, তাড়িয়ে দেয় তাহলে তোর সাথে আমিও চলে যাব। চল্ বাড়ি চল্

মেয়ে রূপী ঈশ্বরের হাত ধরে, একবুক খুশি নিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়ালাম…

administrator

Related Articles