মায়াজাল

মায়াজাল

রুমা ব্যানার্জি

পাহাড়ী রাস্তায় গাড়ি চালাতে বরাবর ভালোবাসে সুজয়,  যখন শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরে অনায়াসে পেরিয়ে যায় পাহাড়ী বাঁক,  ওর কেমন একটা জয়ের আনন্দ হয়। জীবনটাও তো পাহাড়ের মতনই,  কখন কোথায় বাঁক নেবে কেউ জানে না। কেউ জানে না পরের বাঁকে কী অপেক্ষা করে আছে। জীবনও তেমনি। এই সুন্দর তো এই ভয়ঙ্কর।

প্রতি বছর পাহাড়ে আসে ও। একবার নয়, বারবার। তবে এবারের ব্যাপারটা একদম আলাদা। এবার ও একা নয়, সঙ্গে নিবেদিতা আছে। একবার আড় চোখে নিবেদিতার দিকে দেখলো ও। যতবার ও নিবেদিতাকে দেখে অবাক হয়ে যায় আর নিজের ভাগ্যের প্রশংসা করে। সত্যি আজকের দিনে নিবেদিতার মতন মেয়ে বিরল।

“আমার দিকেই সবসময় তাকিয়ে থাকলে কিন্তু খুব মুশকিল। এটা পাহাড়ি রাস্তা মশাই।”

সুজয়ের দিকে চোখ না ফিরিয়েই বলল নিবেদিতা। একটু লজ্জা পেয়ে সুজয় চোখ ফিরিয়ে নিলো। ভ্যাগিস! সামনেই একটা বিশ্রী মোড়। সাবধানে স্টিয়ারিং ঘোরালো। না পারা গেছে, একটু বেখেয়াল হলেই…

আবার একবার সুজয়ের প্রান বাঁচালো নিবেদিতা। কী আশ্চর্য! এই পাহাড়ী রাস্তার প্রতিটি বাঁক তো সুজয়ের নখদর্পনে। তারপরেও ও ভুল করে ফেলছিল। অবশ্য অবাক হওয়ারই বা কী আছে? এই জন্যেই তো ওর বিয়ে হয়েছে নিবেদিতার সঙ্গে। নিবেদিতাই এখন ওর সেই সমুদ্রের তলায় লুকিয়ে রাখা রুপোর কৌটো- যাতে লুকানো আছে সুজয়ের প্রানভোমড়া।

“এই সেই কন্যা,  যে তোমাকে রক্ষা করবে মৃত্যুযোগ থেকে।”

কুষ্ঠিঠিকুজী বিচার করে জানিয়েছিলেন গুরুদেব। সুজয়ের নাকি ভয়ঙ্কর ফাঁড়া রয়েছে সামনে, যার প্রভাবে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। না সুজয় এসব বিশ্বাস করে না কিন্তু সুজয়ের অশীতিপর ঠাকুমা,  নিজের একমাত্র বাপ-মা হারা নাতির সুরক্ষায় কোন কমতি রাখতে চাননি। তাই ছুটে গিয়েছিলেন গুরুদেবের কাছে।

গুরুদেব নিরাশ করেননি। নিজের এক নিষ্ঠাবান শিষ্যের কন্যার কুষ্ঠী বিচার করে জানিয়েছিলেন ঠাকুমাকে। সুজয় রাজি হয়নি কিছুতেই,  চেনা নেই জানা নেই, কোথাকার কে? তাকে বিয়ে করতে হবে? ঠাকুমার জেদাজেদিতে অবশ্য একদিন সাক্ষাৎ করতে রাজি হয়েছিল। আর সেই দেখাতেই সুজয় একদম কুপোকাত। ‘অখন্ড সৌভাগ্যবতী যোগ’  শুনেই সুজয় যেরকম ভেবে নিয়েছিল নিবেদিতা একদম তার বিপরীত। সুন্দরী, শিক্ষিতা এবং ঝকঝকে স্মার্ট একটা মেয়ে।এ রপর আর সুজয়ের আপত্তির জায়গা থাকে না। অসংখ্য মেয়ের ‘হার্টথ্রব’ সুজয় এখন নিজেই নিবেদিতার প্রেমে পাগল। সেই প্রেমকেই জমিয়ে তুলতে সুজয়ের এবারের পাহাড়ে আগমন।

পাহাড়ী প্রকৃতি আরো রোম্যান্টিক হয়ে ওঠে বৃষ্টিতে। তবে অবশ্যই সেটা ঘরের নিরাপদ ঘেরাটোপের মধ্যে। গাড়ী চালাতে চালাতে বৃষ্টি এলে, তা যে কতটা ভয়ঙ্কর সেটা ভুক্তভুগীমাত্রই জানে। এতক্ষন ধরে যে আশঙ্কাটা করছিল সুজয় সেটাই সত্যি হলো। এই তুমুল বৃষ্টিতে চারিদিক ঝাপসা হয়ে গেছে। এদিকে হোটেল পৌঁছাতে এখনো ঘন্টাখানেক লাগবে। কোথাও একটা আশ্রয় দরকার।

খুব আস্তে আস্তে ড্রাইভিং করতে করতে খেয়াল রাখছিল সুজয়।

“ঐ যে…”

আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে ওঠে নিবেদিতা।

একটা ছোট্ট গুমটি দোকান। দোতলা। ওপরে সম্ভবত দোকানের মালিক থাকে।

গাড়িটাকে একপাশে দাঁড় করিয়ে নামে সুজয়। নিবেদিতাকে গাড়িতে বসতে বলে একছুট্টে যায় দোকানের ভেতরে।

ব্যবস্থা হয়েছে।

দোতলায় ছোট্ট একটা ঘর।

তক্তপোশ পাতা। কোন বিছানা নেই। আলো বলতে শুধু একটা মোমবাতি।

এই পরিস্থিতিতে আর কীই বা জুটত?

একটু হলেই এই দোকানের মালিকও বাড়ি চলে যাচ্ছিল। এদিকে বাইরে যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে আজ।

জানলার বাইরে অন্ধকার ক্রমেই জমাট বাঁধছে।

সঙ্গে কিছু শুকনো খাবার আছে, এই নিয়েই আজ চালিয়ে নিতে হবে। দোকানদার এই দুর্যোগের মধ্যে আজ আর কিছুই করতে চাইলো না, দেরী হচ্ছে বলে বাড়ির দিকে পা বাড়ালো।

নিবেদিতা পোশাক পরিবর্তন করে, চুল আঁচড়াচ্ছিল। মোমবাতির আলো ওকে আরো মোহময়ী করে তুলেছিল। সুজয় চোখ ফেরাতে পারছিল না। ঠিক তখনই মোমবাতিটা গড়িয়ে পড়ে গেল তক্তপোশ থেকে,  ওদের কাঠের ঘরটা নড়ে উঠলো খটখট করে।

“ভূমিকম্প”

ওর হাতটা ধরে নিয়ে নিবেদিতা দৌড়াতে লাগল সিঁড়ির দিকে।

দ্রুতবেগে নেমে যেতে লাগল নীচে।

গাড়ির কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সুজয় দেখলো, কাঠের দোতলা ঘরটা হুড়মুড়িয়ে ওর চোখের সামনে ভেঙে গেল। ওফ, আর একটু হলেই…না, সুজয় আর ভাবতে পারলো না। কৃতজ্ঞতায় আরো একবার চোখ ফেরালো নিবেদিতার দিকে।

আজকেই এই নিয়ে দুবার ওকে নিবেদিতা প্রানে বাঁচালো।

ব্যাগপত্তর সব ঐ ভাঙ্গা বাড়ির মধ্যে রয়ে গেছে, তা হোক নিজেরা প্রানে বেঁচেছে ,এটাই অনেক। বৃষ্টিটাও অবশ্য কমেছে।

আজকের রাতটা গাড়িতে বসেই কাটিয়ে দেওয়া যাবে। কাল ভোরের আলো ফুটলেই হোটেলে পৌঁছে একটা ব্যবস্থা করা যাবে। পাশে বসা নিবেদিতার মাথায় একটা হালকা চুমু খেয়ে সুজয় শান্তিতে চোখ বন্ধ করলো।

গাড়ির জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকালো নিবেদিতা। আকাশে ঝকঝক করছে ত্রয়োদশীর চাঁদ। তারপর ফিরে তাকালো সুজয়ের দিকে, মায়াময় মুখ। একবার আলগা করে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। অনেক ঝড় বয়ে গেছে বেচারার ওপর দিয়ে, সকাল থেকে। এবার শান্তি পাবে। গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে নিবেদিতা  ,আস্তে করে ক্লাচে পা দিলো, না বেশী কষ্ট করতে হলো না। গাড়ী নিজেই খাদের দিকে এগিয়ে চলল। এবার নিবেদিতাও চোখ বন্ধ করে জোরে একটা শ্বাস নিলো।

***

“আমি এসব নিয়ে কী করব ঠাম্মী?  তোমার আসল সম্পদকেই তো রাখতে পারলাম না। ওসব তুমি আশ্রমকে দান করে দাও।”

আঁচলে চোখ মুছলেন বিনোদিনীদেবী।এই মেয়েকে তিনি কীনা সন্দেহ করেছিলেন,কতো কটু কথা শুনিয়েছিলেন,তার নাতির জীবন রক্ষা করতে পারেনি বলে।

সবই নিয়তি।

তাকে কে খন্ডাবে?

নাহলে, যে নাতি পাহাড়ী রাস্তায় পক্ষীরাজ ছোটাতো সে কখনো সেই রাস্তায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।নিজের জীবন বিপন্ন জেনেও বৌকে ঠেলে ফেলে দেয় বাঁচাতে।

নাতির ভালোবাসাকে, তার শেষ ইচ্ছাকে তিনি অস্বীকার করবেন না।

আশ্রমেই সব লিখে দিয়ে, নিজের শেষ জীবনটা আশ্রমেই কাটাবেন।

অসুস্থ মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আস্তে আস্তে উঠে পড়লেন তিনি।

নিবেদিতাও পাশ ফিরে চোখ বুঁজলো।ধকল তো কম গেলো না কদিন।গুরুদেবের কাছ থেকে অধীত বিদ্যার প্রয়োগ করে নানান প্রাকৃতিক ঝঞ্জা সৃষ্টি করে প্রথমে শিকারকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা , না হলে যে কার্য সাধন হয় না।মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করতে হয়, নইলে জাল বিস্তার করবে কী করে? তারপর, শেষ মুহূর্তের গাড়ী থেকে লাফ দেওয়া। প্রচুর ঝুঁকি।

তবু করতেই হয়,সে যে গুরুদেবের জন্য, এই আশ্রমের জন্য নিবেদিত।

এবারের মতো সব সফল। এখন কিছুদিন বিশ্রাম।তারপর আবার নতুন পরিকল্পনা, নতুন মায়া…

মায়াজাল….

administrator

Related Articles