আ জার্নি

আ জার্নি

সুস্মিতা কৌশিকী

বেরোতেই এতো দেরি হয়ে গেল, এখন বাস পাওয়া গেলে হয়।রবিবারের দিনগুলোতে যা হয়… এমনিতেই কোথাও বেরোতে ইচ্ছে করে না।সপ্তাহের এই একটি দিন‌ই তো ছুটি। নিজের‌ই কত কাজ। তার উপর স্বামী ও সন্তানের ছোটো ছোটো আব্দার পূরণ।এখন বিকেল সাড়ে চারটে। শীতের সন্ধ্যা কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝুপ করে দিনের আলোটাকে নিজের কোলে টেনে নেবে।একটা হিমেল হাওয়াা দিচ্ছে। রুচিরা চাদরটা একটু টেনে কানদুটোকেও ঢেকে নিলো।আহা!নরম ব্ল্যাঙ্কেটের উষ্ণতা পায়ে জড়িয়ে বড় কফিমাগে এককাপ কফি, সঙ্গে প্রিয় ব‌ই নিয়ে এসময় বিছানায় যেতে পারলেই সবচেয়ে ভালো হতো। কিন্তু তা কি আর হবার জো আছে! একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য দাদার সাথে দেখা না করলেই নয়।

       সব কথা তো আর ফোনে হয়ে ওঠে না। তাই এই অবেলায় রুচিকে ছুটতে হচ্ছে সদর শহর থেকে ৩৫ কিমি দূরে তাদের গ্রামের বাড়ি লতাপাতাতে। যেখানে তার দাদার সপরিবার বাস। আবার ফিরেও আসতে হবে রাতেই। রাত  ন’টা পর্যন্ত বাস পাওয়া যায় এই রুটে।

       শহরের দুটো ময়দানে মেলা চলছে।শীতের মরসুম মানেই মেলার আমেজ। আজ ঝাঁকিয়ে লোক ঢুকেছে শহরে। ভীড়ে ঠাসা বাসগুলো হেলেদুলে বেরিয়ে যাচ্ছে পাশ দিয়ে। রোববার বলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা‌ও বাবা-মায়ের হাতে হাতে মেলা-মুখো। বেশ জমজমাট লাগছে পরিবেশ। মনে হচ্ছে অনেকদিন পর একটা দমবন্ধ অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে সদ্য মুক্তি পেয়েছে সকলে।

       এখন বাস এলেও, বাসে ওঠাই কষ্টকর হবে বোঝা যাচ্ছে।রুচি মনে মনে বিরক্ত হচ্ছিল।ঠিক তখন‌ই একটি গ্রে রঙের মারুতি ওমনির এসে দাঁড়ালো।  ড্রাইভার মুখ বাড়িয়ে ‘পার্বতীপুর  পার্বতীপুর’ বলে নীচু স্বরে দু’বার হাঁক দিলো। পার্বতীপুর থেকে লতাপাতা মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। ওই পথে ই-রিক্সোগুলো চলাচল করে আজকাল। ফলে যাতায়াত সহজ হয়েছে। তাই খুব বেশি না-ভেবে রুচি অদ্ভুত কায়দায় নিজের শরীরটাকে বেঁকিয়ে ওমনির পেটের ভেতরে পুরে দিলো।

        ড্রাইভারের দিকে পিঠ করে বসতে হলো তাকে, এভাবে বসলে উল্টো উল্টো লাগে তাই শাড়িটা গুছিয়ে একটু আড়াআড়ি জানালার দিকে মুখ করে বসলো সে। দৃষ্টি বেশি দূরে প্রসারিত করবার উপায় নেই। রাস্তার দু’ধারে দোকান, বাড়ি দৃষ্টিতে লাগাম লাগায়। গাড়িটা এখনো শহর ছেড়ে বের হয়নি। জ্যামে ঠোক্কর খেতে খেতে এগিয়ে যাচ্ছে।

           ড্রাইভারের পাশে বসা লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে না। তাই বয়সটা অনুমেয় নয়। কিন্তু রুচির সামনে বসা লোক দুটো যথেষ্ট বিরক্তিকর… যা সে আগে লক্ষ‌্যই করেনি।দুজনেই মাঝবয়সী। নোংরা নোংরা পোশাক।বহুক্ষণ আগে পান বা গুটকা জাতীয় কিছু খেয়েছে, যার কষ এখনো ঠোঁটের কোণে লেগে,  শুকিয়ে উঠেছে। একজনের মুখ বসন্তের দাগে বিক্ষত।

           শহর থেকে বেরিয়ে ওমনিটা এবারে গতি পেয়েছে। এদিকটায় রাস্তা বেশ ফাঁকা। মলিন অন্ধকার‌ও নেমে আসছে। দূরে একটা দুটো ঘোলাটে স্থির আলো মিটমিট করে অসহায় চাহনিতে চেয়ে আছে এই গতিদৈত্যের দিকে। গাড়ির ইঞ্জিনের ধাতব শব্দ ভেতরের নীরবতার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে এক প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর গোঙানির মতো আওয়াজ করছে,  যেন মুহূর্তে গিলে খাবে রুচিকে। এই প্রথম রুচির শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। এতোক্ষণে তার মাথায় এলো এই গাড়িতে চারটে অচেনা পুরুষের সাথে সে একা মেয়েমানুষ। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে চেইন অব থটের মতো মনে হতে লাগলো এই লোকগুলো যদি পরস্পরের পরিচিত হয়! কিছুক্ষণ আগে ওরা নীচু গলায় কিছু আলাপ করছিল কি, যখন রুচি ওদের প্রতি মনোযোগী ছিল না।জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকার নিরীক্ষণ করছিল। সে শুনতে পায়নি কিছু ঠিকই কিন্তু মনে হলো সামনে বসা লোক দুটো তাকে বেশ করে লক্ষ্য করছিল এবং নিজেদের মধ্যে কিছু বলাবলি করছিল। যদিও এখন তেমন কোনো আভাস পাওয়া যাচ্ছে না।

            না , বিষয়টা মোটেও ভালো ঠেকছে না রুচির। এই গাড়িতে না উঠলেই ভালো হতো। রূপম ওকে প‌ই প‌ই করে মানা করে এসব অচেনা প্রাইভেট কার-এ  উঠতে। রুচিও অন্যান্য দিন যথাসম্ভব এড়িয়েই চলে এই প্রাইভেট গাড়িগুলো কিন্তু আজকে তেমন কিছু না ভেবেই কিভাবে যে সে চড়ে বসল। এখন নিজের নির্বুদ্ধিতায় ভীষণ রাগ হচ্ছে। হে ভগবান! বিপদ বুঝি এভাবেই আসে। অথচ আজ দাদার সঙ্গে দেখা করাটাও কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই তো এই সন্ধ্যের মুখেও সে বেরিয়ে পড়েছে। অন্যান্য দিন তো দাদাকেও পাওয়া মুশকিল। ব্যাঙ্কের পদস্থ কর্তা তিনি। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। সারাদিনের ক্লান্তির শেষে এসব আলোচনার আর অবকাশ থাকে না। তাই সবদিক দিয়ে রবিবারটাই বরাবরের মতো দু’জনের সুইটেবল বলে মনে হয়েছে।

             ইস্ অন্য কোনো লাইন বাসে উঠলেও এই দুর্ভাবনা হতো না। কী করবে এখন রুচি!রূপমকে কি একটা ফোন করবে?  যেন বাইরের জমে থাকা অন্ধকারকে সম্বোধন করেই প্রশ্নটা করেছে সে, তাই উত্তরটাও মিশে গেল অন্ধকারের আবেশে।না, তা সম্ভব নয়। ফোন করে বলবেটা কী। ‘ আমি একটা প্রাইভেট মারুতি ওমনিতে উঠেছি। যার নম্বর আমি জানি না। বেশ গতিতে সেটা পার্বতীপুরের দিকে ছুটে যাচ্ছে। আর আমি ভয় পাচ্ছি কারণ ড্রাইভার সহ চারজন অপরিচিত পুরুষের সঙ্গী হয়েছি আমি।’

             না। রুচির আধুনিক পরিশীলিত নারীর অহং তাকে বাধা দিলো। রূপমকে বললে এখনিই ফোনে বকাবকি শুরু করবে। কেন বোকার মতো অচেনা লোকেদের সঙ্গে গাড়িতে উঠেছে তার কৈফিয়ত চাইবে, নয়তো এখন‌ই দোকানপাট লোকজন আলো  আছে এমন জায়গা দেখে নেমে যেতে বলবে। আর মিনিটে মিনিটে ফোন করে রুচিকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলবে। রূপমের হরকত রুচির মুখস্থ।

             আচ্ছা! গাড়ির ভেতরে হালকা মিষ্টি একটা স্মেল পাওয়া যাচ্ছে না? এতোক্ষণ তো খেয়াল করেনি সে। এখন‌ই পাচ্ছে। ঘুম ঘুম আচ্ছন্নতা আসছে কি! সেই যে বাজার চলতি স্প্রেগুলো পাওয়া যায়… যা দিয়ে খুব সহজেই মানুষকে অজ্ঞান করে ফেলা যায়… এটা সেরকম কিছু নয়তো? রুচির গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। ‘জালানাটা খুলে দেবো, দরজা খুলে লাফিয়ে পড়বো?  ‘ ধুর কী যা তা চিন্তা মাথায় আসছে। নিজেকে মনে মনে ধমকালো। নাহ্, এভাবে চলবে না। মাথাটা ঠিক রাখতে হবে। ‘আমি ঠিক আছি, ঠিক আছি,  ঠিক আছি’… তিনবার বলে মনের জোর কিছুটা বাড়িয়ে নিলো সে। নিজেকে সংযত করে সেন্সরি অরগ্যান গুলোকে সজাগ করে তুললো।

              আজকাল কত খবর‌ই তো পাওয়া যায়। নিউজ পেপার, টিভি খুললেই একলা মেয়ে পেয়ে নির্যাতন, খুন-ধর্ষণ তো জলভাত ব্যাপার। নিত্য ঘটছে। হায়রে! তেমন কিছু হলে দু-তিনদিন হয়তো রুচির লাশ‌ই খুঁজে পাওয়া গেল না। তারপর ছিন্নভিন্ন পচাগলা একটা দেহ কোনো এক পরিত্যক্ত অঞ্চলে। উফ্, আর ভাবা যাচ্ছে না।         

             কি একটা মনে করে যেন রুচি মোবাইলে নেটওয়ার্ক ডাটা অন করলো। দেখা যেতে পারে কাছাকাছি কোনো ফেসবুক ফ্রেন্ড অনলাইন আছে নাকি। কাউকে কি তার অবস্থার কথাটা বলা যায় এখন… দুশ্চিন্তার মধ্যেও হাসি পেলো রুচির।হায় রে ভার্চুয়াল জগতের ভার্চুয়াল ফ্রেন্ডস!

             ডানদিকের লোকটা বেশি অস্বস্তিকর। একি! জামার আস্তিন গুটাচ্ছে কেন লোকটা।রুচি দাঁতে দাঁত চেপে সোজা কাঠ হয়ে বসলো। লোকটা নীচু হয়ে জুতোর ফিতেটা ঠিক করে বেঁধে আবার মাথা তুলে সোজা হয়ে বসলো। তারপর সিটের মধ্যে শরীরটাকে এলিয়ে দিলো আয়েশে।  

                ‘ইস মোড় সে যাতে হ্যায় কুছ সুস্থ কদম রাস্তে/কুছ তেজ কদম রাহে…’ রুচির মোবাইলের রিংটোন। ‘কী রে? কত দূরে তুই’ … দাদার ফোন  … ‘এই তো আর মিনিট পনেরো’ … একটা জমে থাকা শ্বাস অনেকক্ষণ ধরে মুক্ত করলো রুচি। সামনের অন্য লোকটা কী করছে। রুচির আর ইচ্ছে হলোনা ওদিকে ফিরে দেখার। সে জালানার দিকে মুখ করে অন্ধকারের দিকে চেয়ে র‌ইলো। আর সেখানেই ফুটে উঠলো এক মায়াবী আহ্বান।

            এভাবেই কেটে যাচ্ছে সময়। অন্ধকারের‌ও এক আশ্চর্য দ্যুতি আছে। প্রথমে ভয় হলেও আস্তে আস্তে সয়ে যায়। এই যেমন এখন রুচি প্রায় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে শিশিরে ভেজা পাকা ধানের গাছগুলো কেমন নুইয়ে পড়েছে মাটির কাছাকাছি, নয়ানজুলিতে কচুরিপানার উপনিবেশ, বুড়ো শিবতলা পার হয়ে গেল। ফ্যাকাসে হলদে আলোর নীচে বিষণ্ন আদিদেব একা বসে আছেন ধ্যানমগ্ন ভঙ্গিতে… এই পথ তার বহুদিনের চেনা। একা একা কতবার যাতায়াত করেছে, কখনো এমন অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা হয়নি তার।

           সে কি মানুষের উপর বিশ্বাস হারাচ্ছে… একক বা সামগ্রিক ভাবে। দূরে জনপদের আলো নিকটবর্তী হচ্ছে ক্রমশ, যেন আকুল হয়ে কাছে ডাকছে তাকে… গাড়িটাও দ্রুত ছুটে যাচ্ছে আলোর অভিমুখে।

administrator

Related Articles