অপরূপ রুশকথা

অপরূপ রুশকথা

নয়

সন্দীপন বিশ্বাস

এম ও মাথাই ছিলেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর প্রাইভেট সেক্রেটারি। নেহরু জমানার কথা জানতে গেলে মাথাইয়ের বই পড়তেই হবে। তাঁর একটি বই হল ‘মাই ডেজ উইথ নেহরু’। এই বইয়ের একটা অংশ খুব মজার। ১৯৫৫ সালে নেহরু যখন রাশিয়া যান, তখন তাঁর সঙ্গে মাথাইও ছিলেন। মাথাই লিখেছেন, একদিন দেখলাম মস্কোয় সেলুনে চুল কাটতে যা খরচ পড়ে, সেটা ভারতীয় টাকায় এক টাকার মতো। তখন নয়াদিল্লিতে চুল কাটতে খরচ পড়ত দেড় টাকা। সুযোগ বুঝে এক ফাঁকে বেরিয়ে তিনি মস্কোয় চুলটা কেটে এসেছিলেন।

আর একটা ঘটনা ঘটেছিল। নেহরু মস্কোর রাস্তা দিয়ে চলেছেন। রুশরা তাঁর দিকে ফুলের তোড়া এগিয়ে দিচ্ছেন। নেহরু গোলাপ পছন্দ করতেন। তাই ফুলের বোকেতে গোলাপও ছিল। হঠাৎ একটা ফুলের বোকে ধরতে গিয়ে গোলাপের কাঁটা ফুটল তাঁর হাতে। কয়েক ফোঁটা রক্ত পড়ল। রুশ কর্তারা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। তাঁদের দিকে তাকিয়ে নেহরু মজা করে বললেন, ‘মনে রেখো আমিও রাশিয়ার জন্য রক্ত দিলাম।’ সেদিন তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলেন কন্যা ইন্দিরা গান্ধীও।

রাশিয়ার কথা এলে অবশ্যই মনে পড়বে আমাদের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর কথা। উজবেকিস্তানের তাসখন্দে তাঁর মৃত্যু হয়। মস্কো থেকে তাসখন্দের দূরত্ব অনেক। তিন হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। সেই মৃত্যু নিয়ে আজও অনেক রহস্য থেকে গিয়েছে। তাঁকে খুন করা হয়েছিল, এই সন্দেহ আজও দূর করা যায়নি। তিনি তাসখন্দে গিয়েছিলেন ১৯৬৬ সালে। তাঁর ছেলে অনিল শাস্ত্রী এবং পবন চৌধুরীর লেখা বই থেকে জানা যায় বহু ঘটনা। তার মধ্যে একটা জানাই। তাসখন্দে যাওয়ার উপলক্ষ ছিল পাক প্রেসিডেন্ট জেনারেল আয়ুব খানের সঙ্গে বৈঠক। ৬৫ সালের ভারত-পাক যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত। রাশিয়া তাই নিজেই দু’পক্ষের বৈঠক করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এর রাজনৈতিক কারণ অবশ্য ছিল।

তখন জানুয়ারি মাস। প্রচন্ড ঠান্ডা সেখানে। শাস্ত্রীজি সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন একটা মাত্র খাদির কোট। অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন পছন্দ করতেন তিনি। তাঁকে দেখে রুশ প্রেসিডেন্ট আলেক্সি কোসিগিনের মনে হল, তাসখন্দে এই কোটে ঠান্ডাকে আটকানো যাবে নাকি? তিনি চাইছিলেন সেসব কিছু না বলে শাস্ত্রীজিকে একটা ভারী রাশিয়ান ওভারকোট উপহার দিতে, যাতে ঠান্ডার মোকাবিলা করা যায়। মুখে কিছু না বলে একটা অনুষ্ঠানে সম্মান জানাতে গিয়ে কোসিগিন তাঁকে একটা রুশ কোট উপহার দিয়ে বললেন, ‘আপনি এটা তাসখন্দে পরবেন।’ শাস্ত্রীজি হেসে হেসে বললেন, ‘কী দরকার ছিল, আমি তো একটা কোট দিল্লি থেকে এনেছি।’ পরে কোসিগিন শাস্ত্রীজিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘কোটটা পরে কেমন লাগল?’ শাস্ত্রীজি উত্তরে বলেছিলেন, ‘আসলে এক অফিসার আমার সঙ্গে এসেছেন, তিনি ভালো গরমের পোশাক আনতে ভুলে গিয়েছিলেন। তাই আপনার উপহার দেওয়া কোটটা তাঁকে ব্যবহার করতে দিয়েছিলাম। তবে অবশ্যই আমি আপনার কোটটা ভবিষ্যতে ব্যবহার করব।’ কোসিগিন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন শাস্ত্রীজির দিকে। পরে তিনি বলেছিলেন, ‘শাস্ত্রীজিকে দেখে মনে হয়েছিল, আমরা কমিউনিস্ট হতে পারি, কিন্তু উনি হলেন সুপার কমিউনিস্ট।’

শাস্ত্রীজির মৃত্যু নিয়ে রহস্য রয়েই গিয়েছে। সেই রহস্য নিয়ে পরে লিখব।

ভারতীয় রাজনৈতিক প্রধানদের সঙ্গে রাশিয়ার সবসময় কূটনৈতিক যোগাযোগ ছিল। সেটাই তো স্বাভাবিক। বিশেষ করে একটা সময় পর্যন্ত ভারত ছিল রুশ পন্থী। কিন্তু ভারতীয় শিল্প-চলচ্চিত্রের সঙ্গেও নিবিড় বন্ধন তৈরি হয়েছিল রাশিয়ার। এ ব্যাপারে প্রথমেই নাম করতেই হয় রাজকাপুরের। রাশিয়ায় বিশেষ করে মস্কোয় ছিল তাঁর প্রচুর ফ্যান।

স্তালিনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিধিনিষেধে ছিল রসাস্বাদনের বেড়ি। শিল্প সংস্কৃতির নান্দনিক তত্ত্বকে যে রাজনৈতিক তত্ত্বের বন্ধনে বাঁধা যায় না, মহৎ শিল্প-সাহিত্য সেই কথাই বলে। কমিউনিস্ট মানসিকতাকে পুষ্ট করার সাহিত্যই কেবল সাহিত্য বা সংস্কৃতি বলে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ স্লোগানধর্মী শিল্পসাহিত্যের ছককে মেনে চলার দাদাগিরি নিয়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথ তৈরি করতে চেয়েছিলেন স্তালিন। সেই সময় রুশ দেশের বহু শিল্পী সাহিত্যিক এর প্রতিবাদ করেছিলেন। তার মধ্যে ছিলেন নিকোলাই বুখারিন। তিনি বললেন, উদার শিল্পী মনে এভাবে কোনও তত্ত্বের ভার চাপানো ঠিক নয়। বুখারিন ছিলেন বলশেভিক পার্টির তাত্ত্বিক নেতা, বুদ্ধিজীবি, লেখক এবং সংবাদপত্র ‘প্রাভদা’ র সম্পাদক। স্তালিন এতে কি খুশি হয়েছিলেন? না, তিনি খুশি হননি। বুখারিনকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে খুনের নির্দেশ দেওয়া হল। সেই নির্দেশের কথা শুনে নোবেলজয়ী ফরাসি লেখক ও দার্শনিক রোমা রোলাঁ চিঠি লিখলেন স্তালিনকে। বুখারিনকে ক্ষমা করা হোক। রাশিয়ার আজ বুখারিনকে প্রয়োজন। ফরাসি বিপ্লবের সময় বিজ্ঞানী আন্তোয়ান  ল্যাভয়জিয়েকে (স্কুলপাঠ্যে যাঁকে ল্যাভয়সিয়র নামে জেনেছিলাম)  গিলোটিনে হত্যা করা হয়। হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের নামকরণ তাঁরই করা এবং তিনিই দেখিয়েছিলেন, দহনকার্যে অক্সিজেনের ভূমিকা রয়েছে। তার কয়েক বছরেই পরে ফরাসী সরকার ভুল স্বীকার করে বলেছিল, ল্যাভয়জিয়েকে বিনা দোষে হত্যা করা হয়েছে। বুখারিনের ক্ষেত্রে যেন তা না হয়। কিন্তু স্তালিন সে কথায় কান দেননি। বুখারিনকে গুলি করে মেরে এক ‘দেশদ্রোহীকে’ সরিয়ে দিয়েছিলেন। বিরোধিতা করেছিলেন আলেক্সি রিয়াকভও। তাঁকেও স্তালিন গুলি করে মেরে ফেলেন। অসংখ্য হত্যার কথা। বলে শেষ করা যাবে না।

স্তালিন জমানার লৌহশাসনের অবসান হল ১৯৫৩ সালে।  স্তালিনের মৃত্যুতে দেশের মানুষের সঙ্গে শিল্পী সাহিত্যিকরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। কিছুটা নরমপন্থী ক্রুশ্চেভ ক্ষমতায় আসার পর বাইরের সংস্কৃতিকে রাশিয়ায় আমদানি করার ব্যাপারে তিনি ছাড়পত্র দিলেন। আর ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে মস্কোয় রিলিজ করল রুশ ভাষায় ডাব করা রাজকাপুরের ছবি, ‘ব্রদগয়া’। মূল হিন্দি ছবিটি হল ‘আওয়ারা’। ছবি রিলিজ করতেই মস্কোয় ব্যাপক সাড়া পড়ে গিয়েছিল। রুশ সরকারের আমন্ত্রণে রাজকাপুর মস্কো যান। সঙ্গে ছিলেন ছোট্ট ঋষি কাপুর। রাজকাপুরকে সম্মান জানাতে রুশ সরকার জানিয়ে দেয়, রাজকাপুরের ভিসার কোনও প্রয়োজনই নেই। তাঁকে সাদর আমন্ত্রণ। ঋষি কাপর পরে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাঁর বাবা যে গাড়িতে বসেছিলেন, তাঁর রুশ ভক্তরা সেটিকে কাঁধে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। মেরা নাম জোকার ছবিতে রাজকাপুর রুশ ব্যালে শিল্পী ও অভিনেত্রী সেনিয়া রিয়াবিনকিনাকে অভিনয় করিয়াছিলেন।

সেই সময় রাশিয়ায় ভারতীয় ছবির ভালো বাজার তৈরি হয়েছিল। তারপরে সেখানে রিলিজ করে শ্রী ৪২০। এছাড়া দিলীপ কুমার, দেব আনন্দের ছবিও রিলিজ করেছিল। রিলিজ করেছিল নিমাই ঘোষের ছবি ছিন্নমূল। তবে রাজকাপুর ছিলেন তাঁদের নয়নের মণি। অন্য যে ছবিগুলি রাশিয়ায় ভালো ব্যবসা করেছে, সেগুলি হল, ববি, জিতা (সীতা) অ্যান্ড গীতা, মমতা, ডিস্কো ড্যান্সার।

রাজ কাপুরের পর মিঠুন চক্রবর্তীই হয়ে ওঠেন রুশ সিনেপ্রেমীদের কাছে সবথেকে জনপ্রিয়। মিঠুনকে রুশরা জিমি বলে ডাকতেন। ওটা ডিস্কো ড্যান্সারের চরিত্রটার নাম। তখন রুশ মহিলাদের খুব প্রিয় গান ছিল, ‘জিমি, জিমি আজা আজা।’ রাশিয়ায় ডিস্কো ড্যান্সার সেই সময় আট কোটি ডলার ব্যবসা করেছিল।

১৯৮৬ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট গর্বাচভ ভারত সফরে আসেন। সেই সফরে এক অনুষ্ঠানে আমাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী তাঁর সঙ্গে অমিতাভ বচ্চনের আলাপ করিয়ে দেন। গর্বাচভ রাজীবকে বলেন, আমার মেয়ে শুধু মিঠুন চক্রবর্তীকেই চেনে।

তবে বর্তমান প্রজন্মের বেশ কিছু মস্কোবাসীর সঙ্গে কথা বলেও আমি কোনও রাজকাপুর বা মিঠুন চক্রবর্তীর ফ্যানের সন্ধান পাইনি। একজন রবীন্দ্রনাথের কথা বলেছিলেন। তিনি শুধু তাঁর নামটুকুই জানেন। তবে কেউ নেতাজির নাম শোনেননি। তাঁরা জানেন না, নেতাজি রাশিয়ায় গিয়েছিলেন কি না এটুকু জানার জন্য আজও বাঙালি কতটা ব্যাকুল।

administrator

Related Articles