বঙ্গ সংস্কৃতি

বঙ্গ সংস্কৃতি

দীপঙ্কর দাশগুপ্ত

একদা শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘‘কবিতা মর্মরফল শূন্যতার নীলিমার দ্যুতি।’’ সেই দিন কবেই কেটে গেছে, শক্তি নেই। তবে এই শহরে এখনও তিনি চলমান অশরীরি। তাঁর মৃত্যুতে রাষ্ট্র তোপধ্বনি করে তাঁকে বিদায় জানায়, ফৌজি বাজনায় শোনা যায় লাস্ট পোস্ট। কবিতা উৎসবের সময় তাঁর কথা সবার মনে পড়ে যায়। কাল্ট ফিগার ছিলেন শক্তি।

তবে শুধু শক্তিই নয়, আমাদের এই শহরের অলিগলিতে শক্তির মতো অনেক কাল্ট ফিগারই ছিলেন, এবং এখনও আছেন। বঙ্গ সংস্কৃতি এখনও পুরোপুরি ফসিল হয়ে যায়নি বোধহয়। যেমন নীরদ মজুমদারের মতো তান্ত্রিক-শিল্পী (ফরাসিয়ানা এবং কালীভক্তির এক দুর্লভ কম্বিনেশন), তস্য ভ্রাতা কমলকুমার মজুমদারের মতো শব্দ-সাধক, ঋত্বিক ঘটকের মতো কালেকটিভ-আনকনশাস-খ্যাপা বা বারীণ সাহার মতো উদাসীন নির্লিপ্ত ফিল্ম ডিরেক্টর।

এই সব লোকজনদের জন্যই হয়তো এই শহরের কালচারে একটা খ্যাপাটে রঙ আছে। ব্যবসা-বিমুখ, রোজগার-বিমুখ কলকাতার সমস্ত আনুগত্য যেন আর্ট অ্যান্ড কালচারে। সবার মধ্যেই একটা যূথবদ্ধ অভিমান এই ব্যাপারটাতে। হঠাৎ সবাই একসঙ্গে মিলে কবিতা লেখা শুরু করে। হঠাৎ সবাই একসঙ্গে গায়ক হয়। হঠাৎ সবাই ছবি-করিয়ে। ‘‘আমি’’ নয় ‘‘আমরা’’।

“এই এখন আমরা যে গল্পটা লিখছি’’, কমলকুমার মজুমদার একবার বলেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে। ‘‘আমরা কে কমলদা?’’ বিস্মিত সুনীল প্রশ্ন করেছিলেন কমলকুমারকে। ‘‘আমরা মানে আপনি যে গল্পটা লিখছেন আর তার সঙ্গে সঙ্গে আমরা লিখছি?’’ কমলবাবু উত্তর দিয়েছিলেন— ‘‘আহ চুপ কর না। ঠাকুর আমাকে দিয়ে গল্পটা লেখাচ্ছেন। তোমাকে দিয়েও লেখাতে পারতেন।’’

কিন্তু বাঙালি কি পাল্টায়নি? আজ সকালেই আফশোস করছিলেন এক বামপন্থী অগ্রজ। ‘‘মা কী ছিলেন, আর কী হইলেন?’’ এই ছিল তাঁর আক্ষেপ। আমার নির্লিপ্ততা দেখে আরও ক্ষিপ্ত হলেন যেন। বললেন, ‘‘দেখছেন না চারপাশে কী হচ্ছে? দুয়ারে অমুক-দুয়ারে তমুক, আদিখ্যেতার শেষ নেই!এটা কি বাংলার সংস্কৃতি, বলুন? এমনকী কমিউনিস্টরাও সেই লাইনে…?’’ ‘‘ঠিকই তো’’ বলে পা বাড়ালাম বাজারের দিকে।

শক্তি-নীরদ-ঋত্বিক বা কমলকুমাররা এই সমস্যাকে কীভাবে দেখতেন? নিশ্চয়ই ‘কগনিটিভ ডিজোনেন্স’ বলতেন। আমি নিশ্চিত ‘হিপোক্রিসি’ বলতেন না। কবিরা ত্রিকালদর্শী হন, তাই হয়তো বলে গিয়েছিলেন, ‘‘ভুলে যেয়োনাকো তুমি আমাদের উঠানের কাছে/‌ অনন্ত কুয়ার জলে চাঁদ পড়ে আছে…’’

administrator

Related Articles