বাঙালির খাওয়া দাওয়া

বাঙালির খাওয়া দাওয়া

বৈঠকখানা ডেস্কঃ বাংলার খাবার-দাবার কিম্বা খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে জানতে গেলে সেই রামায়ণ, মহাভারত, ঋগবেদ-এর দ্বারস্থ হতে হয়। ঘাঁটতে হয় বিভিন্ন পুঁথি, পুরাণ ও সাহিত্য সম্ভার। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যগুলি থেকেও বাঙালির খাবার-দাবার ও খাদ্যাভ্যাসের ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষ করে মানিক দত্তের চণ্ডীমঙ্গল, এছাড়াও বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল, কবিকঙ্কনা মুকুন্দের চণ্ডীকাব্য, নারায়ণ দেবের পদ্মপুরাণ প্রভৃতির উল্লেখ করা যায়। সেই প্রাচীন যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের মূল কাঠামোটি মোটামুটিভাবে ঠিক থাকলেও সময়ের ব্যবধানে ভারতবর্ষে তথা এ বঙ্গে নানা জাতিগোষ্ঠীর আগমন ও ঔপনিবেসিক আমলে আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে প্রতিনিয়তই যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন সব অনুষঙ্গ।

প্রাচীনকালে বাঙালির খাওয়া-দাওয়া প্রসঙ্গে নীহাররঞ্জন রায় তাঁর বাঙালির ইতিহাস-এ লিখেছেন- আদিতে ধান যে-দেশের প্রথম ও প্রধান উৎপন্ন বস্তু, সে-দেশের প্রধান খাদ্য তো ভাত হবেই। ধনী থেকে গরিব সকলেরই প্রধান খাদ্য ছিল ভাত। বাঙালির মাছ ও মাংস সম্পর্কে লিখেছেন- নদনদী-খালবিলময় বাংলায় মাছ যে অন্যতম প্রিয় খাদ্য হবে এও স্বাভাবিক। তবে মাংসের প্রতিও বাঙালির বিরাগ কোনোদিনই ছিল না। তবে মাংসের মধ্যে হরিণের মাংস খুবই প্রিয় ছিল, বিশেষভাবে শবর, পুলিন্দ প্রভৃতি শিকারজীবী লোকেদের মধ্যে এবং সমাজের অভিজাত স্তরে। ছাগ মাংসও বহুল প্রচলিত ছিল সমাজের সকল স্তরেই। কোনও কোনও প্রান্তে ও লোকস্তরে, বিশেষভাবে আদিবাসী কোমে বোধ হয় শুক্নো মাংস খাওয়াও প্রচলিত ছিল।  

বাঙালির তরিতরকারি খাওয়া সম্পর্কে তিনি লিখেছেন- যে-সব তরকারি আজও আমরা ব্যবহার করি, তাহার অধিকাংশই, যেমন বেগুন, লাউ, কুমড়ো, ঝিঙে, কাঁকরোল, কচু প্রভৃতি তরকারি বাঙালি সুপ্রাচীন কাল থেকেই ব্যবহার করে আসছে। তবে পর্তুগীজ এবং অন্যান্য নানাসূত্রে নানা তরকারি, যেমন আলু আমাদের খাদ্যের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। যা প্রাচীনকালে ছিল না। নানা ধরণের শাক খাওয়ার অভ্যাসও বাঙালির অতি প্রাচীন।

পুর্তগীজ নাবিক ভাস্কো দ্য গামা, বিশেষ করে ইংরেজ ও ফরাসিদের হাত ধরে বাঙালির হেঁসেলে ঢুকে পড়েছিল কাঁচালঙ্কা। এছাড়াও কামরাঙ্গা, আনারস প্রভৃতি। পুর্তগীজরা আমাদের আরও দুটি জিনিস খাওয়া শিখিয়েছিল। সে দুটো জিনিস হল ডাল ও সর্ষে। অনেক রকম ডাল আমাদের মাটিতে জন্মালেও আমাদের ডাল খাওয়ার অভ্যেস ছিল না। কলার পাতায় ফেনসহ গরম ভাত, গাওয়া ঘি, গরম দুধ, ময়না মাছ, পাটশাক- এই ছিল খাদ্যাভাস। অন্যদিকে নিম্নবর্গের লোকজন তিল থেকে যে তেল হয় সেটা ব্যবহার করত রান্নার কাজে।

পুর্তগীজরা আমাদের সর্ষের তেল খাওয়া শিখিয়েছিলেন। শুধু যে পুর্তগীজ, ইংরেজ আর ফরাসিরাই ইউরোপ থেকে আমাদের জন্য নানা অনুষঙ্গ এদেশে নিয়ে এসেছিল। এছাড়া চীনা ব্যবসায়ীরা জলপথে চিন থেকে লিচু, চিচিংগা ও সুমাত্রা থেকে বাতাবিলেবু সহ আরও বহু জিনসিপত্র বাংলায় নিয়ে এসেছিল। লিচু ও চিচিংগা নাম দুটো দেখলেই কিন্তু বোঝা যায় যে চীন থেকে এসেছে। যেমন লাইচি শব্দ থেকে বাংলায় লিচু আর চীনা ভাষায় চিচিংগা শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘বহুবর্ণের সাপ’।

আমাদের খাদ্যাভ্যাসের একটা ধারণা পাওয়া যায় হিউয়েন সাঙ আর মানরিকের লেখা থেকে। সম্ভ্রান্ত ধনী লোকের বাড়িতে সেকালে খাবার দাবারের এত প্রাচুর্য ছিল যে, সেগুলো খেতে বহু সময় লাগত। হিউয়েন সাঙ-এর বর্ণনা থেকে জানা যাচ্ছে, বাংলায় খাওয়ার সময় আয়োজন হত প্রচুর। গৌড়ে এক মুসলমান বাড়িতে পর্যটক মানরিক নিমন্ত্রিত হয়ে এসে এমন আয়োজনের মধ্যে পড়লেন, যে খেতে তার তিন ঘণ্টা সময় লেগে গেল। পাশাপাশি মানরিক এটাও লক্ষ্য করেছিলেন যে, গরিব লোকেরা ভাত, লবণ, শাক ও অল্প কিছু তরকারির ঝোল খেত। কখনও কখনও দই ও সস্তা মিষ্টি। আমানি বা পান্তা ভাতের জল ছিল গরিবদের প্রধান খাদ্য।

administrator

Related Articles