বাবা! বাড়িই সবচেয়ে ভালো!

বাবা! বাড়িই সবচেয়ে ভালো!

ঊর্ণনাভ

আমার মতে ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ ঋত্বিকের একটি মনস্তাত্ত্বিক ছবি। যতই আমরা ছবিটিকে কমার্শিয়াল ছবি বলে হেলাফেলা করিনা কেন, এখানে কাঞ্চনকে ঘিরে যেসব বাস্তবচিত্র ও মনস্তত্ত্ব ফুটে উঠেছে তা অভাবনীয়, এক্ষেত্রে শিশু মনস্তত্ত্ব বললে ভুল হবে। কারণ বাস্তবচিত্রটা তুলে ধরতে গিয়ে কাঞ্চনের চোখে একটা অভিজ্ঞ রাসভারী ছাপ টের পাওয়া যায়। এবং ক্যামেরার অভাবনীয় এক ব্যবহার। কলকাতার যানজটকে ধরার জন্য ১৯৫৯-এর সময়ে ৩০০ মিমি লেন্সে যেখানে দেখা যাচ্ছে ট্রলির উপর মহানগরীর ব্যস্ত মোটর, ট্রাম অ্যাম্বাসেডর যে হুইলের দৃশ্য, গাড়ি ছুটে চলেছে অথচ মনে হয় তার চাকা স্থির হয়ে আছে, অথবা হাওড়া ব্রিজের সেই সব এক্সট্রিম লং শটে লেন্সের এমন ব্যবহার সচরাচর দেখা যেত না।

যাই হোক, এখানে আমার আলোচনা কাঞ্চনের বাড়ি ফেরার দৃশ্য। তার আগে তার পলায়ণপর জীবনের একটু ভূমিকা হয়ে যাক —

ছবির প্রধান ভূমিকয় অভিনয় করেন— পরম ভট্টারক লাহিড়ী (কাঞ্চন), জ্ঞানেশ মুখার্জি (কাঞ্চনের বাবা), পদ্মা দেবী(কাঞ্চনের মা), কালী ব্যানার্জি (হরিদাস), জহর রায়, সতীন্দ্র ভট্টাচার্য,  শ্রীমান দীপক, কেষ্ট মুখার্জি,  শৈলেন ঘোষ(নন্দ)। ছবির শুরুতে দেখা যায় কাঞ্চন; অতি চঞ্চল, দুরন্ত ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় এক কিশোর। বাবাকে যে দৈতের সঙ্গে তুলনা করছেন। যার কড়া শাষণে অতিষ্ট হয়ে একদিন তার স্বপ্নের শহর কলকাতায় পালিয়ে যায়। এরপর শহরের বিচিত্র সব ঘটনার অভিজ্ঞতা হতে থাকে। কলকাতা দেখে প্রথমে তার তাক লেগে যায়। পেল্লায় সব অট্টালিকা, ব্রিজ, স্টেশন, জাহাজ, জাদুঘর, ট্রাম, মানুষের ভিড়, যন্ত্রের ব্যস্ততম নগরী তার স্বপ্নের দেশ। দেখা হয় হরিদাসের সঙ্গে। হরিদাস যে শহরের অলিগলি ঘুরে বুলবুল ভাজা বিক্রি করে বেড়ায়। পরিচয় হয় গৃহপরিচারিকা মা, কনক নামের এক বালিকা ও তার পরিবার, বোবা ভিক্ষুক ছেলে, ম্যাজিশিয়ান, চোর, মজুর এবং আরও সব নিম্নবিত্ত মানুষের সঙ্গে। যাদের সঙ্গেই তার দেখা হয় তারা কোনো না কোনোভাবে দেশছাড়া, উদ্বাস্তু, অনাথ। কাঞ্চন তাদের কাছে অদ্ভুত এক জীবনের গল্প শোনে। একদিকে গগনচুম্বী ইমারত অন্যদিকে বস্তি শহরতলির অন্ধকার জীবন। একদিকে বিত্তবান মানুষের ফেলানো ছড়ানো জীবন অন্যদিক একটু খাবারের জন্য কুকুর মানুষের লড়াই। এরকম একদিন হরিদাস খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে তাকে জানায় তার মা অসুস্থ তার বাড়ি ফিরে যাওয়া উচিত। 

এখানে বাড়ি ফেরার পথে নৌকার উপর যে ফ্রেমটা কাঞ্চনের কলকাতা থেকে গ্রামে (কাজলদিঘী) ফেরার দৃশ্য। সম্ভবত, ৩৫মিমি লেন্সের ওয়াইড অ্যাঙ্গেল শট। যেখানে ফোর গ্রাউন্ডে নৌকার উপর বসে কাঞ্চন, দাঁড় বাইছে নন্দ(শৈলেন ঘোষ) অদূরে নদী পাড়, পাড় ধরে ঘোড়ার পিঠে চলেছেন রক্ষী এবং চারজন বেয়ারা সহ একটা পালকি ব্যাকগ্রাউন্ডে সমান্তরাল ভাবে উঠে আসছে। একদিকে নন্দর সংলাপে ভেসে আসছে— ‘শেষ পর্যন্ত ফিরলে’। অন্যদিকে দাঁড়ের জলকাটার শব্দ ছাপিয়ে উঠছে পালকির গান ‘হেঁই সামালো’। সাধারণত, তৎকালীন সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে এসব আয়োজন থাকত।

এখানে যতদূর আন্দাজ করতে পারলাম, পালকির ভিতরে কোনো নারীচরিত্রবিশেষ বসে আছেন। হয়তো কোনও গৃহবধূ অথবা নবপরিণীতা শ্বশুরঘর থেকে বাপের বাড়ি ফিরছেন। মোট কথা একটা ফেরা, প্রত্যাবর্তন এখানে দেখাতে চেয়েছেন। আরও একটি ব্যাপার, ছবিটি বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে শ্যুট করা হলেও গল্পের পটভূমি তিরিশের দশকের। সেসময় রাস্তাঘাটে রিক্সার প্রচলন শুরু হওয়ায় পালকির ব্যবহার বন্ধ হয়ে আসে; ফলতঃ এও এক কারণ হতে পারে সমকালীন বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে পেক্ষাপটটা নদীর প্রবহমান অবিনশ্বরতার সঙ্গে আঁকতে চাইছেন।

মূলকথা, জীবনের বয়ে চলার গল্প, এক থেকে অন্যত্র অথচ সব পথ এসে বাঁক নেয় ফেলে আসা পথে; ঘরে ফেরার পথে। শতধারায় এসে মিশে যায় সেই জন্মের পথে। অর্থাৎ যে পথে একদিন পথিক আসিয়াছ সেই পথেই ফিরিতে হইবে রঙ্গতামাশা শেষে।

আজ হঠাৎ একজনের পোস্টে পেলাম আজ ‘পিতৃ দিবস’’। তা আমাদের বাবা চরিত্রটি ওই কাঞ্চনের বাবা (জ্ঞানেশ মুখার্জী) মতই বিরাট ভয়ংকর,  দৈত্যস্বভাবী, কাঠখোট্টা, স্নেহহীন। মনে হয় সন্তানসন্ততির সমস্ত দামালপনাকে সহস্তে দমন করাই যেন তাঁর জীবনব্রত। অথচ মায়ের স্নেহের আড়াল হয়ে যাওয়া বাবাদের আমরা খেয়াল করি না। সন্তানকে একবার বুকে তুলে নেওয়ার জন্য তার যে কী করুণ আকুতি দায়বদ্ধতার কাছে খাটো হয়ে যায়। খেয়াল করি না দৈত্যাচারের বাইরে আমাদের পিতারাও কাঞ্চনের বাবার মতই অসহায়, অস্থির হয়ে আনাগোনা করেন ঘাটের পাশে, পথের ধারে। বুকের পরতে পরতে হাত বুলিয়ে খুঁজে ফেরে সন্তানের মুখ। এটা আমৃত্যু চলতে থাকে। মেঘে ঢাকা তারা নীতার বাবা হোক অথবা কাঞ্চনের বাবা সন্তানের চিন্তা দ্বন্দ্ব তাদের সুস্থির থাকতে দেয় না। মনে মনে প্রশ্ন চলতে থাকে— হ্যাঁ রে, অনেক কিছু দেখলি তাই না? আচ্ছা সবচেয়ে ভালো কোনটা লাগল বলত? কিংবা ঝাপসা কাঁচের দৃষ্টি দিয়ে উদয়গগনে লাঠি তুলে সূচিত করেন ‘সূর্যোদয়’ অর্থাৎ বরাভয়। চরম মিথ্যাচার হবে যদি একথা স্বীকার না করা যায়— বাবা! বাড়িই সবচেয়ে ভালো!

administrator

Related Articles