বাসা-বাড়ি

বাসা-বাড়ি

দীপঙ্কর দাশগুপ্ত 

কবি প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত তাঁর ‘অপরিণামদর্শীর জন্য’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘‘যেভাবে বুকের মধ্যে মাঝেমাঝে তবলা লহড়া বেজে ওঠে, ঠিক সেইভাবে এস/‌ আমরা উদ্বাস্তু, তবু ঘড়বাড়ি চাই…।’’ তিনিই আবার কোনও এক জায়গায় লিখেছিলেন, ‘‘বাড়ির বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’’ উদাস প্রকৃতির মানুষ, ব্যোমভোলা ধরনের। বেশ মানিয়ে যায় কথাগুলো ওঁর চরিত্রের সঙ্গে। একটা বয়স অবধি আমরা প্রত্যেকেই বোধহয় ওরকম থাকি। বাড়ির বিষয়ে কিছুই জানি না। কিন্তু, তারপর কখন একদিন বুঝতে শিখি, যে আসলে এটা সত্যি নয়।

বহুদিন মনে ছিল আশা… ধন নয় মান নয়…ধরণীর কোণে এতটুকু বাসা। রবীন্দ্রনাথ যেন এ জন্যই বড় কবি আমাদের কাছে, কেননা তিনি বাঙালির ইচ্ছে-অনিচ্ছের সীমাগুলো বুঝতে পারতেন। ‘‘বৃষ্টিভেজা বাড়ির মতোই রহস্যময়/‌তোমার হাতে আছে আমার একটু সময়…’’, অরুণ সরকারের এই কবিতার কেন্দ্রবিন্দু তো একটা বাড়িই। স্কুলে পড়ার সময় কুমুদরঞ্জন মল্লিকের একটা কবিতা পাঠ্য ছিল— ‘‘বাড়ি আমার ভাঙন-ধরা অজয় নদীর বাঁকে/‌জল যেখানে সোহাগ করে স্থলকে ঘিরে রাখে।’’

হাড়েমজ্জায় গৃহতৃষ্ণায় ভরা বাঙালি আমি। জীবন থেকে বাড়িকে বাদ দিই কী করে? ‘ঘর বাঁধা’, ‘ঘর ভাঙা’, ‘ঘর-গেরস্থালি’, ‘গেরস্ত’— এই সব কথা শুনতে শুনতেই তো বুড়ো হওয়া। এমনকী বাঙালি মধ্যবিত্ত রসিকতার মধ্যেও তো আছে ঘর। প্রমাণ চাই? দুই বাঙালি সহযাত্রীর গল্প। দু’জনেই চলেছেন এলপ্ল্যানেডগামী ট্রামে। একজন পূর্ববঙ্গীয়। অপরজন খাঁটি শ্যামবাজারের শশীবাবু।

তো পূর্ববঙ্গীয় ভদ্রলোক কিছুক্ষণ পরেই সহযাত্রীর সঙ্গে আলাপ জমানোর চেষ্টা শুরু করলেন। প্রথম পর্বে তাঁর প্রশ্ন— ‘‘দাদা আপনাগো বাসা কই?’’ শ্যামবাজারের শশীদাদার কাছে প্রশ্নটা মোটেই ভাল ঠেকল না। উত্তর দিলেন না কথাটার। ভাবতে লাগলেন, ‘‘বাসা? কেন বাসা কথাটা বলল লোকটা? বাসা তো থাকে পাখির। আর পাখিই যখন ভাবছে আমাকে, ভাল কোনও পাখি কি ভাবছে?নিশ্চয়ই আমাকে শকুন ভাবছে।’’

এবার বের হল তাঁর মুখ থেকে উত্তর— ‘‘তোর বাবা শকুন!’’

administrator

Related Articles