কুসমী বনের পথে

কুসমী বনের পথে

নিবেদিতা ঘোষ রায়

মনে হয় যেন এইমাত্র হুলুক পাহাড়ের গায়ে ট্রাক থেকে নামলাম।গা ভর্তি লাল ধুলো।দুটো শালপাতা উড়ে গেল ট্রাকের পেছন পেছন।দিলীপের বাবা মহুয়া খেয়ে টলতে টলতে লাঠি দিয়ে ঝোপ পিটিয়ে আগে আগে যাচ্ছে হাইল্যান্ড গেস্ট হাউসের দিকে।দিলীপ বুদ্ধদেব গুহুর নাম জানে না।জানে অরপোনা সেনের নাম, আর “মুনার দি” (মোহনার দিকে) সিনেমায় সে দেখেছে এই পাহাড়, টাঁড়, মহুয়া গাছ, আর গেস্ট হাউসের বারান্দার ছবি।কেচকি থেকে মারুমারের দিকে লড়ঝড়ে জিপ নিয়ে ধোঁয়া ফুঁকতে ফুঁকতে চলে গেল আজারুদ্দিন বেতলার নঈহারকে বাঁয়ে রেখে। মহুয়াডাঁর চিপাদোহর, লাতেহারের ওপর দিয়ে শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেস যাচ্ছে। ম্যাকলাক্সি গঞ্জে দেখলাম রেল লাইনে এক দেহাতি কাটা পড়েছে।আদিবাসি মুর্ম সাঁওতাল কাহারদের রঙিন ভিড়। পাশেই লেবু ছোলা বেচছে পরেশনাথ।টেঁটরা মানিয়া, নানকুয়া জমাট বাঁধা অন্ধকার ফুঁড়ে কিকরা পাহাড়ে উঠছে, মকাই ক্ষেত পাহারা দিতে। পাকদণ্ডী পথ ধরবে।পরেশনাথ এইখানে কাঁকোড় ফুল খোঁজে বুলকির জন্য।ট্যাঁ ট্যাঁ করে কর্কশ চাবুকের মত ডাকতে ডাকতে সবুজ এক ফালি মেঘ কাঁপতে কাঁপতে আসছে মকাই ক্ষেতে।মুঞ্জরী ক্ষ্যাপার মত হাঁড়িমুখো চকে গোল্লা দেওয়া তাড়ুয়া ঘোরায়। মুঙ্গেরী দোনলা গাদা বন্দুক হাতে কাড়ুয়া বনের শিশির মাড়িয়ে চুপে মাটির ঢিবির মতো শুয়ে আছে।কোটরা হরিণ শিমুল ফল চিবোচ্ছে দাঁতে ঘস ঘস শব্দ। কাড়ুয়া টি-টি পাখির মত ডানা ছড়িয়ে অপেক্ষা করে ঝারিতালাওয়ের পাশে।কচু ক্ষেতে বড়কা দাঁতাল  ফিস ফিস করে ওকে ডাকে। কাদায় টিপটিপে বৃষ্টিতে তিন আঙ্গুল বারুদ গেদে ঝেড়েই দিয়েছিল। বড়কা কাদা ছিটিয়ে শটি চারা লন্ডভন্ড করে হড়কে এই দৌড়লো। শব্দ পাচ্ছি।নানকুর বাবা অন্ধ টিগা লাঠি হাতে একা বসে হলুদ কালো কাটাকুটি হুলুক পাহাড়ের সেই জায়গাটায়।পাহাড়ে জুম চাষের আলোর মালা বহুদূর পর্যন্ত।ম্যাকলাক্সির দিলীপের বাবা মহুয়া, বাজরার ছাতু খেয়ে সূর্য থেকে প্রতি কনা অনু পরমানু শক্ত হয়ে যাওয়া খটখটে হাড়ে মেখে নিচ্ছে রাতের হিমের সঙ্গে লড়ার জন্য।হাতি নিয়ে রামধনিয়া চাচা এসেছে,নঈহারের সামনে, গুহার চাতালে বাঘ ফিরে এসেছে যাবে তো চলো। শিশির ফুরোলে ডেরার গভীরে ঢুকে যাবে। সারারাত ধান ক্ষেতে সড়াৎ সড়াৎ শব্দ পাকা ধান টেনে নেওয়ার।তারপর অন্ধকার রাতে অধিকতর অন্ধকার পিন্ড সমষ্টি আস্তে পাহাড়তলীর জঙ্গলে ফিরে যাবে। আর তখনি ছ’ফুট লম্বা কুৎসিত মুখ হাঁড়িবন্ধু ধূমায়িত কাঁচ কালো লন্ঠন নিয়ে খেটো ধুতি পড়ে ছোটকুঁই এর ফরেস্ট গেটে বাইসনের তাড়া খেয়ে হাজির হয়। এক ঝাঁক লেসার হর্নবিল নিস্কম্প ডানায় ভেসে শিমূল গুঁড়ির ওপর ছায়া ফেলে যায়। ডালটনগঞ্জ থেকে ধুলো উড়িয়ে বাস আসে। কোয়েলের ছিপছিপে জলে হলুদ শাড়ি পড়া পঁচিশ বছরের আমি তাকিয়ে থাকি মুচুকবানী পাহাড়ের দিকে।শীতের বেলায় একদল শম্বর দৌড়ে রাস্তা পাড় হয়। সাদা বালির ওপর দিয়ে এদিকের জঙ্গল থেকে কোয়েল পেরিয়ে আস্তে আস্তে ওদিকের জঙ্গলে যাচ্ছিল একদল বাইস ন।আপনার যখন নিউমনিয়া হয়েছিল বুদ্ধদেব বাবু তখন এই কোয়েল পেরিয়ে গাড়ু থেকে জিপে আনা হয়েছিল আপনাকে অচৈতন্য।

আমি বিশ্বাস করি না আপনি নেই।আদিগঅন্ত জঙ্গল পাহাড় ঘেরা মুলিমালোঁয়ার সেই মোহময় শীতার্ত রাতে ফৈজুর গানের বিলকুল বেঁহুশ নেশা ছেড়ে, চাঁদ বাবু, বাইধর, ঠাকুরানির জঙ্গলের দীর্ঘ সাদা গেন্ডুলি গাছের অশরীরী হাতছানি ছেড়ে আপনি কোথায় যাবেন।কুয়োতলায় সর্ষেরঙা রোদে গর্ভিণী হাঁসের মতোই বেলা ভরন্ত হয়ে এল।ওই দেখুন গাঢ খয়েরী শম্বরটা, গ্রীষ্মের বনে আলো ছায়ায় লুকোচুরি খেলে এইমাত্র বেরিয়ে এল। দেখলেন তো!

administrator

Related Articles