প্রাণের নিকেতনে: জোড়াসাঁকোর ধারে

প্রাণের নিকেতনে: জোড়াসাঁকোর ধারে

শ্রমণা সাহা

“কার বাড়ি?”   “ঠাকুর বাড়ি।” 

“কোন ঠাকুর? “ওবিন ঠাকুর- ছবি লেখে।”

জোড়াসাঁকোর ধারের দুই ঠাকুর বাড়ি- ছয় নম্বর ও পাঁচ নম্বর দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন। দুই বাড়ির ছেলেমেয়েদের মধ্যে ভারি ভাব, খুব মিলমিশ। ছয় নম্বরের ব্রাহ্মসমাজ অনুসারী নিয়ম পালন আর পাঁচের মুর্তি পূজোর সাবেকি নিয়ম পালনের জায়গাটিকে বাদ দিলে দুই বাড়ির জীবনযাত্রার ধরনও একরকম – পড়াশোনা, গান-বাজনা, নাটক, শিল্প-সাহিত্য চর্চায় ভরপুর; দুই বাড়িতেই গুণীর সমাবেশ চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার মতো।

উক্ত ‘ওবিন ঠাকুর’ টি পাঁচ নম্বর ঠাকুরবাড়ির বাসিন্দা। তাঁরও ভারি মিল, এবং মিশ, ছয় নম্বরে তাঁর ‘রবিকা’র সঙ্গে – তাঁর বাবার আপন জ্যাঠতুতো ভাই, তাঁর থেকে বয়সে বছর দশেকের বড়। দুই বাড়ির এই দুই ঠাকুরের পোষাকী নাম অবনীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ।

কাকার মতো ভাইপোও খুব কম বয়সে স্কুল পালিয়েছেন। স্কুলে না গিয়ে নিতে গিয়েছেন ছবি আঁকার পাঠ, আর সেই সঙ্গে করেছেন নিজের ইচ্ছা মত পড়াশোনা। প্রতিভাঋদ্ধ ভাইপোর গুণগুলির আভাস পেয়েছিলেন কাকা, একের পর এক সেগুলির প্রস্ফুটন হয়েছে তাঁর সাহচর্যে ও চালনায়।

রবি ঠাকুর লিখলেন ‘চিত্রাঙ্গদা’, দায়িত্ব পড়ল তরুণ শিল্পী অবন ঠাকুরের উপর বইটিকে ছবি এঁকে সাজিয়ে তোলার। রবিকাকার উৎসাহে নবীন চিত্রকারের হাতে শোভিত হয়ে উঠলো চিত্রাঙ্গদা। খুশী হয়ে কাকাও বইটি উৎসর্গ করলেন ভাইপোকে। “তুমি আমাকে তোমার যত্নরচিত চিত্রগুলি উপহার দিলে, আমি তোমাকে আমার কাব্য এবং স্নেহ-আশীর্বাদ দিলাম।”  অবনীন্দ্রনাথ পরে স্মৃতিচারণ করে বলেছেন : “এখন অবশ্য সে-সব ছবি দেখলে  হাসি পায়। কিন্তু এই হলো রবিকাকার সঙ্গে আমার প্রথম আর্ট নিয়ে যোগ।” এই আর্টের যোগ এরপর চলে নিরন্তর, রচনা হতে থাকে শিল্প সৃষ্টি ও বিনিময়েরর দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস।

রবীন্দ্রনাথ মনে করলেন তাঁর গানে harmony সৃষ্টি করবেন। এই প্রয়াসকে সফল করতে সহযোগী হলেন অবনীন্দ্রনাথ; বিশিষ্ট Harmony রচয়িতা ইটালিয়ান মিউজিক মাস্টার সিয়োঁর মানজাটোকে সন্ধান করে নিয়ে এলেন রবিকার প্রয়াসটিকে রূপদান করতে। রবীন্দ্রনাথ মাইকেল এঞ্জেলোর জীবনী দিলেন পড়তে অবনীন্দ্রনাথকে, সেই সঙ্গে দিলেন রবিবর্মার ছবির অ‍্যালবাম, কারণ তাঁর মতে “হাজারই হোক, আমাদের দিশি বিষয় এবং দিশি মূর্তি ও ভাব আমাদের কাছে কতখানি, এই ছবিগুলি দেখলে তা বেশ বোঝা যায়।” দেশের চিত্রশিল্প-বিদ্যালয়গুলিতে যে ইউরোপীয় চিত্রকলার অনুকরণে আঁকা শেখানো হতো সেটি রবীন্দ্রনাথের একান্তই অপছন্দের ছিল, কারণ তাতে “হাত এবং মন বিলাতি ছবির ছাঁচে প্রস্তুত হইয়া যায়, তাহার আর কোনো উপায় থাকে না।” এরপরই ই. বি. হ্যাভেলের সঙ্গে মিলে চিত্রকলায় “বেঙ্গল স্কুল”-এর উদ্ভব করেন অবনীন্দ্রনাথ। এবং এখানেও স্বীকৃতি দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ভূমিকাকে। “রবিকাকা আমায় বললেন, বৈষ্ণব পদাবলী পড়ে ছবি আঁকতে। রবিকাকা আমাকে এই পর্যন্ত বাতলে দিলেন যে চন্ডীদাস বিদ্যাপতির কবিতাকে রূপ দিতে হবে। লেগে গেলুম পদাবলী পড়তে। প্রথম ছবি করি ভারতীয় পদ্ধতিতে গোবিন্দদাসের দু-লাইন কবিতা।”

বাড়ির ছেলেমেয়েদের জন্য জোঁড়াসাকোর বাড়িতেই একতলায় স্কুল খুললেন রবীন্দ্রনাথ। “হাল্কাভাবে কিছু হবার জো নেই, যেটি ধরছেন নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা চাই। নিজেও বই লিখলেন, আমাকে দিয়েও লেখালেন।” অবনীন্দ্রনাথও মাস্টারমশাই হয়ে বসলেন বাংলা পড়াতে। কিন্তু পড়াবেন কী, তিনি তো আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে আশ্চর্য সব গল্প বলে শোনাচ্ছেন ছেলেমেয়েদের! সেই গল্প শুনে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‌তোমাকে গল্প লিখতে হবে। শুনে আকাশ থেকে পড়লেন অবনীন্দ্রনাথ! বললেন, সে আমি পারব কেন? রবীন্দ্রনাথ ছাড়লেন না। “যেমন করে তুমি গল্প কর, তেমনি করে লিখবে। ভাষার গোলমাল হয় তো আমি আছি।” লেখা হলো শকুন্তলা। এমন মনের জগতের দরজা খুলে দেওয়া লেখা বাংলা সাহিত্যে বিরল। এরপর একে একে লেখা হল ক্ষীরের পুতুল, নালক, রাজ কাহিনী, ভূতপত্ রীর দেশ, আরো কত বই, বেশির ভাগই ছোটদের জন্য, কাব্যময়, ছন্দে ভরপুর, কল্পনায় মধুর সব লেখা, কলমের আঁচড়ে এসে লাগে তুলির টান – “ছবি লেখেন” অবন ঠাকুর।

একরকম রবিকাকার হাতেই গড়ে উঠেছেন অবনীন্দ্রনাথ, অথচ রবীন্দ্রনাথের কোনোরকম প্রভাব নেই তাঁর সৃষ্ট সাহিত্য বা চিত্রকলায়; নিজস্বতায়, স্ব-মহিমায় তিনি থেকেছেন উজ্জ্বল।

একটা সময়ে পাঁচ নম্বর ‘বৈঠকখানা বাড়ি’টি প্রাধান্য পেতে শুরু করেছে, মূলত গগনেন্দ্র-অবনীন্দ্র দুই ভাইয়ের শিল্পগুণে এবং খ্যাতিতে। প্রাচ্যশিল্প অনুরাগী বহু বিদেশী ও দেশী মানুষের যাওয়া আসা এই বাড়িতে তখন, এবং এঁদের উদ্যোগে ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, অবনীন্দ্রনাথের আঁকা ছবি বিভিন্ন চিত্রপ্রদর্শনীতে পুরস্কৃত হচ্ছে, এমন একটা সময়ে শিল্পী উইলিয়াম রদেনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম পরিচয় হয় এই বৈঠকখানা বাড়িরই দক্ষিণের বারান্দায়; রদেনস্টাইন –  রবীন্দ্রপ্রতিভাকে পাশ্চাত্য জগতে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে যাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য, যাঁকে রবীন্দ্রনাথ উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর ‘গীতাঞ্জলি’

রবীন্দ্রনাথ-অবনীন্দ্রনাথের আজীবন শিল্প-সৃজন-সংস্কৃতি সংযোগের বৃত্তটি যেন সম্পূর্ণতা পেল যখন পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ অবনীন্দ্রনাথকে তাঁর অবর্তমানে বিশ্বভারতীর আচার্য পদটি গ্ৰহন করতে অনুরোধ করলেন। অবনীন্দ্রনাথ প্রত্যুত্তরে সেদিন বলেছিলেন, শান্তিনিকেতনে তিনি পেট ভরানোর খাদ্য আগেই পেয়েছিলেন, এবারে পেলেন মন ভরানোর অন্ন।

আর, বাঙালির প্রাণের এই যুগল ঠাকুরের গভীর পারস্পরিক শিল্প-সম্পৃক্ততা ও সাংস্কৃতিক আত্মীয়তাকে যেন অমরত্ব দান করে নিবিড়ভাবে বেঁধে রাখতে চাইল একটি তারিখ – বাইশে শ্রাবণ। এক বৃষ্টিস্নাত শ্রাবণী বাইশের সকাল; অবনীন্দ্রনাথের জন্মদিন; এই বাইশে শ্রাবণ তিনি হলেন সত্তর।  সেদিনই, তাঁর রবিকা – তাঁর সুহৃদ, পথপ্রদর্শক, সহচর – যাত্রা করলেন অমৃতধামের উদ্দেশ্য।

কিন্তু তাঁর যাওয়া তো যাওয়া নয় যাঁর মন “তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে, কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে” – এই ক্ষয়হীন, অনিঃশেষ পূর্ণতার পায়ে পায়ে স্থান চেয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধিতে, জন্ম মৃত্যু – এ দুইয়ে মিলিয়ে জীবনের সত্য, সৃষ্টির সত্য; তাই বাঙালির কাছে এই দিনটি মৃত্যুশোক করার দিন নয়, দুটি উৎসবের উদযাপনের দিন – একটি উৎসব জন্মদিনের, অন্যটি – জীবনের পূর্ণতা প্রাপ্তির। “পুরাতনই মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে আপন চিরনবীনতা প্রকাশ করে, এই তো বসন্তের উৎসব।” – শ্রাবণবরিষণ পার হয়ে যেন বয়ে বয়ে আসে এই চিরনবীন বসন্তেরই বাণী।

রবিকার সমর্পিত সব দায়িত্ব যেমন মাথা পেতে নিয়ে এসেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ এতদিন, সেভাবেই আচার্য পদটি স্বীকার করে এগিয়ে নিয়ে চলার দায়িত্ব নিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রাণের বিশ্বভারতীর। আর তাঁর সাথে ‘নিত্যকালের আলো’, ‘সৃষ্টি-উৎসের আনন্দধারা’ হয়ে জীবনের বিচিত্র গৌরবে উদ্ভাসিত রইল যে আকাশটি, তার নাম রবীন্দ্রনাথ।

administrator

Related Articles