লাল নীল সংসার

লাল নীল সংসার

সৌমী চৌধুরী

উল কাঁটা এখনও বুনতে শিখি নি, তবে শিখে নেবো।

একটা মাফলার বানাবো।

না, না, একটা না, তিনটে।

একটা সাদা বর্ডার দেওয়া সাতরঙা- এটা কোনো স্পেশাল অকেশনে পরবো, এই যেমন কেউ বিকেলের চা খাওয়ার নেমন্তন্ন করলো বা আমিই কাউকে ডাকলাম সন্ধ্যের জলখাবারে।

দ্বিতীয়টা খয়েরী রঙের- তোমার হাফ সোয়েটারের সাথে ম্যাচ করা। ওইটা তোমায় দেবো।

আরেকটা হবে নীল রঙের – প্রুশিয়ান ব্লু। ওইটাও তোমাকেই দেবো। তুমি বলবে, দুটো নিয়ে কি করবে তুমি! তাই নীলটা আবার আমাকেই ফেরৎ দেবে। আমি একটু চুপ থেকে ফেরৎ নিয়ে গলায় জড়িয়ে বলবো – আহ, আরাম!

আসলে তো আমি জানতামই তুমি একটা ফেরৎ করবেই আর সেটা ওই নীল রঙেরটাই। নীল যে তোমার প্রিয় রঙ। আর আমাকেও তুমি রঙিন দেখতে চাও কি না!তাই ইচ্ছে করেই দুটোই তোমায় দিয়েছিলাম, যাতে তোমার রঙটা তোমার হাতে করেই আমার কাছে আবার ফিরে আসে।

তুমি খয়েরী মাফলারটা হাতে নিয়ে ভাঁজ করবে ধীরে ধীরে। আমি বলবো, “কি হ’ল, পরলে না যে!” তুমি বলবে, “এখন রাখি, টুপি তো পরাই আছে, আরেকটু ঠান্ডা পড়লে পরবো।” তারপর ভাঁজ করা মাফলারটা সাইড ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখতে রাখতে খুঁজে পাবে ব্যাগের এক কোণে রাখা আমার জন্যে আনা বাতের মলম। ভুলেই গেছিলে দিতে। ব্যস্ত সমস্ত হয়ে বের করতে গিয়ে চশমার খাপটা যাবে পড়ে। আমি বাতের ব্যথা নিয়ে নিচু হয়ে খুঁজতে যাবো যেই, তুমি বারণ করবে, বলবে- “বরং এক কাপ চা খাওয়াও, আমি চশমা, মলম সব ঠিক করে রাখছি।”

আমি দু কাপ চা করে টিপটে সাজিয়ে আনবো। পুরো একটা টি সেট- দুটো কাপ, টিপট, চিনি আর দুধের আলাদা পট। সবই খালি। টিপয়ে গরম জল আর চায়ের কাপে ডিপ। চিনি দুধ তো খাওয়া বারণ। তাই ওগুলো খালিই সাজানো। আগুনের কাছে আমার যাওয়া বারণ। তাই ডিপ দিয়েই চা খাওয়া। তারপর গুছিয়ে বসবো বারান্দায় গোল টি টেবিলের দুপ্রান্তে। বেশ ছবির মতো সবুজ বাগান সামনে। আর কাঠের বারান্দায় সাদা টেবিলের ওপর সোনালী বর্ডার দেওয়া কাপে চুমুক দিতে দিতে তুমি বলবে “আহ্! চা টা কি সুন্দর বানিয়েছো!” আমি লজ্জা পেয়ে বলবো, “যাহ্, এটাতো ডিপের চা, এতে আবার বানানোর কি আছে?” তুমি বলবে, “কে বলেছে! কতক্ষণ ধরে ডিপটা ভিজিয়ে রাখতে হবে যাতে স্বাদটা ঠিকঠাক আসে আবার তেতোও না লাগে সেটাও তো একটা ব্যাপার নাকি!”

পাশে রাখা উল কাঁটাটা এমনিই হাতে নিয়ে আবার সরিয়ে রেখে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে তাকিয়ে থাকবো সামনের দিকে। তুমিও ঐদিকেই তাকিয়ে বসে। দৃশ্য কিছুই পাল্টাবে না। কথা আর কেউ বলবো না। শুধু একইদিকে তাকিয়ে থাকবো দুজনে অনেকক্ষণ, যতক্ষণ না সন্ধ্যে পার করে ঘুর্ঘুটটি অন্ধকার নামে।

আমার আঁচলটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নেওয়া দেখে তোমার খেয়াল পড়বে, এবারে ঘরে যেতে হবে। বলবে, “চলো তাহলে উঠি।” আমিও যেই উঠতে যাবো তুমি চেয়ারটা চেপে ধরে বলবে -“আস্তে, হাঁটুতে লেগে যাবে তো”। তারপর দুজনে হাঁটতে থাকবো ঘরের দরজার দিকে – একজনের পায়ে বাত বলে হাঁটার সমস্যা আর একজন অন্ধকারে আজকাল আর ভালো দেখে না – দুইজন মানুষ একে অপরের অবলম্বন হয়ে অন্ধকার দরজার দিকে এগোবো। দরজার ওপারে কি আছে ঠাওর হয় না।

এই একটা রাত- ঠান্ডা পড়বে খুব। ঘরে ঢুকে আমি আলো জ্বালবো আর তুমি জানলা দরজাগুলো ভালো করে বন্ধ করবে। তারপর রুম হিটার জ্বেলে পাশাপাশি চেয়ারে বসে থাকবো ঘড়ির দিকে চেয়ে। কথা তো আর বলার কিছুই বাকি নেই। হাতটুকু না ধরেও পাশে থাকার অনুভূতিটুকু বেঁচে থাকবে।

রাত্রে কাঞ্চার বউ এসে খাবার দিয়ে যাবে, যেমন দিয়ে যায় রোজ দুবেলা। ডিনার টেবিল সাজিয়ে খেতে দেবো তোমায়। রাত্রের খাবারে যদিও স্যুপ আর পাঁউরুটি, তাও টেবিল সাজাবো পরিপাটি- বোন চায়নার বাসন, কার্টলারি সেট, কটন ন্যাপকিন, ওয়াশ বোল।

তোমার বিছানাটা ঠিক করে তোমাকে শুইয়ে গায়ে চাদর ঢাকা দিয়ে একটা একটা করে লাইট নিভিয়ে আমি নিজের ঘরে এসে শোবো। ঘুম আসবে না। বাইরে ঝিঁঝির ডাক ছাড়া আর কিছু শব্দ নেই। নিস্তব্ধ নিশ্চুপ।

হঠাৎ করেই তুমি- “শুনছো”- এই, শুধু এই ডাকটার জন্যই তো এতদিনের অপেক্ষা করে থাকা- আমি সাড়া দেবো, “হুঁ”।

-“একটু জল দেবে?”

জানি দুজনেই বিছানার পাশেই রাখা গোল টেবিলে জাগ আর গ্লাস আছে রাখা- তবুও, এটাই তো অছিলা। এর জন্যেই তো দুজনেরই অপেক্ষা, ছুঁতো খোঁজার ছুঁতো। আমি আস্তে আস্তে উঠে যাবো তোমার কাছে। তারপর তোমার বিছানায় তোমার পাশে তোমার চাদরের তলায় সেঁদিয়ে যাবো। তুমি হাত রাখবে আমার কোমরে। দুজনের নিঃশ্বাস অনেকদিন আগেই ধীরে পড়ে, তবুও খানিক গরম নিঃশ্বাস আর ওমের খোঁজে আরো গুটিয়ে নিয়ে তোমার সাথে জড়িয়ে যাবো।

এই ছোঁয়াচটুকুর অপেক্ষাই ছিলাম দুজনেই। নিঃশব্দে ঘুম এসে জড়িয়ে ধরবে আমাদের। দুজনেই আজ ঘুমের ওষুধ ছাড়াই ঘুমবো।

পরের দিন সকালে আমার ঘুম ভাঙবে একটু দেরীতে। দেখবো যথারীতি তুমি নেই পাশে। সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর পা আরোই নড়াতে কষ্ট। তাও উঠে এসে দেখবো- ডাইনিং টেবিল সাজানো আছে কালকের রাতের মতোই এঁটো বাসন সমেত, বারান্দায় চায়ের কাপের সাথে টি সেটও। বাগানের গেট আধ খোলা। অনেকটা নিচে একজন মানুষ হেঁটে চলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে- হাতে লাঠি, গলায় নীল মাফলার। তুমি ফিরে যাচ্ছো তোমার ছেলের বাড়ি, তোমার আস্তানায়। মিথ্যে রাগ দেখিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলে শুধু আমার কাছে আসবে বলে। আমি বুঝবো তোমার বাড়ি ফেরার তাড়ার কারণ, একটুও অভিমান করবো না।

ফিরে গিয়ে বসবো টি টেবিলে- সেখানে রাখা আছে কিছু ডেইজি, ভোর বেলায় তোমার হাতে তোলা, আমার জন্য।  

ছবি-লেখক

administrator

Related Articles