সতেরো পর্ব

সতেরো পর্ব

সপ্তপর্ণা বসু

সেদিনের সন্ধ্যা

অনুরাগদের কটেজের সামনে সবাই বসে আছে। এখানেই চা আর ফ্রাইড মোমো দিয়ে গেছে তামাং। সবাই আড্ডার মুডে। অনুরাগ বলল,  ‘সত্যি তোমরা আসাতে এই জায়গাটায় খানিকটা প্রাণ এলো যেন!বেশি নির্জনতা মাঝে মাঝে দম বন্ধের মতো লাগে’।

চিনার বললো, ‘তোমরাই তো খুঁজে পেতে এই জায়গাটা বার করেছ’

রুপম বলল, ‘না জায়গাটা কিন্তু দারুণ’

কুর্চি বলল, ‘হ্যাঁ, সেটা কিন্তু ঠিক’

রুক্সার সবার ছবি তুলছিল নানা অঙ্গেল থেকে। অনুরাগ বললো, ‘আজ তো ঋষিখোলা গেলে,কেমন লাগলো?’

সৃতমা বললো, ‘না গেলে ভীষণ মিস করতাম কাকু’

আরিয়ান বললো, ‘আপনারা  কি আজ এখানেই ছিলেন?’

–না একটু ঘুরে এলাম সিলেরি গাঁও

আরিয়ন বলন – কাল আমরা যাবো ভাবছি ওদিকটা, trek করতে

–হ্যাঁ ঘুরে আসতে পারো, মন্দ নয়, তবে আমার অবশ্য এই জায়গাটা অনেক বেশি ভালো লেগেছে।

চিনার বললো– আমার তো সিলেরি গাঁও ও বেশ ভালো লেগেছে।

নয়না বললো– পথের দেখা পথেই শেষ হয়ে যাবে কিনা জানি না তবে কলকাতায় ফিরে যোগাযোগ রাখলে ভালো লাগবে।

চিনার বললো–  প্লিজ মা, এটা ওই পুরনো বাংলা সিনেমার ডায়ালগের মত শোনাচ্ছে

সবাই হেসে উঠলো।

সৃতমা বললো– নিশ্চয়ই রাখবো

শিরোনাম যোগ করলো– এখন তো মোবাইল আছে, whatsappআছে

রুক্সার বললো– ছবিগুলো পাঠাব , কুর্চিদি তোমার whatsapp no টা দেবে

কুর্চি বললো– অবশ্যই।

জয়ী  জিজ্ঞেস করলো– কাল কখন যাচ্ছেন?

অনুরাগ বললো– ওই ব্রেকফাস্ট করে দশ টা নাগাদ

চিনার বললো– তোমারা সবাই প্রেসি?

সৃতমা বললো– হ্যাঁ রে

কুর্চি বললো– প্রেসিডেন্সি শুনলেই মার একটা আলাদা নস্টালজিয়া কাজ করে

রুক্সার বললো– আপনিও?

–হ্যাঁ, বাংলা

চিনার বললো– উফ বাংলা নিয়ে কেউ যে কি করে পড়ে!

কুর্চি কপট ধমকের সুরে বলল– চিনার, এইসব বলবে না। বাংলা হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ট ভাষার মধ্যে একটি।

অনুরাগ ওর শান্ত গলায় বলল– সে বিষয়ে কোনো সংশয় নেই রে।

চিনার বললো– আমার বাবার ফেভারিটে জোন হলো ‘বাংলা ও বাঙালি’ আর মায়ের ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত’।

মৈনাক এতক্ষণ চুপ করে বসেছিলো, বললো– আপনিও গান গান?

–একসময় গাইতাম

চিনার বললো– ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি মা খুব ভালো গান গাইতো, সবটাই পাস্ট টেন্স, আমি সে ভাবে মায়ের গান কোনোদিন শুনেছি বলে মনে পড়ে না, বরঞ্চ বাবাই বেশি গায়।

নয়না প্রসঙ্গটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেবার জন্য বলল– এখান থেকে কি কলকাতায় নাকি অন্য কোনো প্ল্যান-

শিরোনাম বললো–  মাঝে দুদিন মুর্তিতে স্টে-

অনুরাগ বললো– তোমাদের গান কিন্তু কাল খুব ভালো লেগেছে।

আরিয়ান বললো– মৈনাক, সৃতমা, রুপম ওরাই ভালো গায় আমি বেসুরা, বাকিরা অল্প সুরা।

নয়না বললো- আজ কিন্তু গান শুনবো

রুক্সার বললো- এই মৈনাক গা না, তোর তো গান লগ্নে জন্ম

কুর্চি বললো– ও কি আমার বাবার মতন,সব সিচুয়েশনেই গান-

জয়ী বললো– হ্যাঁ একদম

সৃতমা বললো–  সে তো আছেই, তাছাড়া ওর আরেকটা পরিচয় হলো ও প্রতিমা বসুর নাতি আর সুচিস্মিতা বসুর ছেলে।

যে অধ্যায়টা ভুলে থাকতে চায় নয়না সেটা আবার সবকিছুকে পিছনে ফেলে সামনে এগিয়ে আসছে। সেই সব দিনগুলো… একটা অদ্ভুত ভালোলাগা নয়নাকে আচ্ছন্ন করলো।

– তুমি সুচিস্মিতার ছেলে!

চিনার বললো– আরে মা তো প্রতিমা বসুর ছাত্রী! তাই না মা?

নয়না বললো – তখন তোমাদের বালিগঞ্জের বাড়িতে ক্লাস হতো।

মৈনাক হাসলো– হ্যাঁ, শুনেছি।

– এখন তো হাজরাতে একটা স্কুল করেছেন না!

মৈনাক বললো– হ্যাঁ।

–উনি নিজেই ক্লাস নেন নাকি এখনও?

–না না, মাঝে মাঝে দিম্মা যান কিন্তু ক্লাস নেন না। মা-ই maximum ক্লাস নেয় আরো অনেকে নেন, দিম্মার সব ছাত্রীরা। 

–হ্যাঁ সেই, ওনার তো বয়সে হয়েছে! মাঝে মাঝে খুব দেখা করতে যেতে ইচ্ছে করে কিন্তু আর হয়ে ওঠে না

মৈনাক বললো– আসুন না একদিন-

চিনার বললো– ব্যাস হয়ে গেলো।

অনুরাগ হঠাৎ একটু চুপ করে গেল। শুধু বললো– এতক্ষণে বোঝা গেলো তোমার এই গানের গলার রহস্য।

নয়না বললো– আজ আমাকে একটা গান শোনাবে কিন্তু।

আজ চাঁদের আলো অনেক ম্লান,সেই একই শান্ত নির্জনতায় ঢাকা প্রকৃতি, কিছু মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে আর তারই মাঝে কখনো কখন ভেসে উঠছে উজ্জ্বল আলোতে ভরা বিশাল বিরাট আকাশ।

মৈনাক গান শুরু করলো-

“আজি যত তারা তব আকাশে

সবে মোর প্রাণ ভরি প্রকাশে।

নিখিল তোমার এসেছে ছুটিয়া….”

কিছুক্ষন পর নয়নাও ওর সাথে গেয়ে উঠলো,

“মোর মাঝে আজি পড়েছে টুটিয়া হে,

তব নিকুঞ্জের মঞ্জরী যত আমারি অঙ্গে বিকাশে…”

মৈনাক কয়েকটা লাইন গেয়ে থেমে গেলো।

নয়নার গানের মধ্যে যে প্রাণ ছিলো তা মৈনাককে মুগ্ধ করলো। নয়না নিজের জগতে কোথায় যেনো হারিয়ে গেছে। কুর্চি, চিনার অবাক হয়ে মায়ের গান শুনছে, সেই তারা ভরা রাতে, পাহাড়ি নির্জনতায়,  নয়নার গান সবাইকে এক নিস্তব্ধ আবর্তে যেন বেঁধে রাখলো। অনুরাগ উঠে নয়নার পাশটাতে গিয়ে বসলো, একটা হাত রাখলো নয়নার কাঁধে।

জল জমাট বাঁধছে নয়নার চোখে, আকাশের উজ্বল তারারা আস্তে আস্তে  ঝাপসা হয়ে আসছে নয়নার চোখের তারায়।

administrator

Related Articles