সতেরো পর্ব

সতেরো পর্ব

সপ্তপর্ণা বসু

গন্তব্যে পৌঁছে

গাড়িটা মেইন রোডের ওপরেই একটা সাইড করে দাঁড়ালো।রাস্তার একদিকে বেড়া দেওয়া দরজার ভেতরে দিয়ে বাহারি ফুলের সারি উঁকি দিচ্ছে, যেন রঙের মেলা বসেছে,রাস্তার সেদিকটাতে ছোট ছোট বাড়ি আর প্রতিটা বাড়ির সামনেই ফুলের বাহার। অন্যদিকে খাড়াই পাহাড়ের গায়ে উলম্ব গাছেদের রাজত্ব।সেখানেও পাহাড়ের নীচে স্থানীয় বাসিন্দারা ছোট ছোট নার্সারি মতন করে রেখেছে, নানান অর্কিড তাদের বাহারি রূপের যেন প্রতিযোগিতার পসরা বসিয়েছে। ওরা গাড়ি থেকে নামতেই মি.তামাং আর ওনার স্ত্রী সবার গলায় একটা করে সিল্ক-এর স্কার্ফ জড়িয়ে অভ্যর্থনা জানাল।

অল্প বয়সী একটা ছেলের হাতে চাবিটা দিয়ে বললেন, ‘ভাইয়ালোগোকো ঘর খুল দো’

রিসেপশন এর পাস দিয়ে পাহাড়ের খাদ ধরে নেমে যাওয়া সিড়িটার দিকে হাত দেখিয়ে মি.তামাং বললেন, ‘ ইসিসে যাইয়ে।’

ছেলেটা ওই সিড়ি দিয়ে তরবড়িয়ে নিচে নেমে গেলো, টয়লেট যাওয়ার তাড়ায় জয়ীও ওর পেছন পেছন হাঁটা লাগলো। অন্যরা মি. তামাং আর ওনার স্ত্রীর সাথে কথা বলছিল।গাড়ির মাথায় বেঁধে রাখা লাগেজগুলো ড্রাইভার দাদা এক এক করে নামাতে লাগলেন।

জয়ী টয়লেট থেকে বেরিয়ে দেখলো সামনে একটা লম্বা বারান্দা, সেখানে দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেলো,সামনেই সোনালী পাহাড়ের চুড়া দেখা যাচ্ছে একেবারে স্পষ্ট, কোথাও কোনো বাধা নিষেধ নেই, জয়ী উৎফুল্লতায় চিৎকার করে সবাইকে ডাকতে লাগলো– সবাই please একবার এদিকে আয়, আই এম জাস্ট spellbound…

লাগেজগুলো তখনও নামানো শেষ হয় নি, ড্রাইভারকে টাকা দেওয়ার আছে, হঠাৎ জয়ীর ডাক পেয়ে শিরোনাম ততোধিক জোরে গলা তুলে বললো, ‘তুই স্পেলবন্ড থাক, তোর লাগেজ পড়ে রইলো বাইরে’।

মৈনাক জয়ীর ব্যাগটা তুলে নিলো ওর কাঁধে।

আরিয়ান বললো, ‘এই তো সবে ব্যাগ বওয়া শুরু’

মৈনাক বললো, ‘চাটিস না তো’

রুপম ওর ব্যাগ আর গিটারটা কাঁধে ঝুলিয়ে রাস্তার ধারে খাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো, সৃতমা ডাকলো, ‘ওই মেঘপিয়ন এদিকে আয় রে,তিনদিনে অনেক সময় পাবি খাদ দেখার’

রূপম ওখান থেকেই চিৎকার করে বললো, ‘আমি সত্যিই এবার পাগল হয়ে যাবো’।

পাহাড়ে বাড়ি যেমন হয়, রাস্তার সাথে লাগানো একটা তলা তার উপরে আরেকটা তলা আছে, নীচের খাদ ধরে ধাপে ধাপে নেমে গেছে অন্য তলাগুলো।

সবাই মিলে লম্বা বারান্দাটায় লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। শিরোনাম এসে সৃতমার কাঁধে হাত রেখে বললো, ‘গুরু কি জায়গার সন্ধান দিলো মাইরি,থ্যাংক ইউ’। রুক্সার ওর ক্যামেরাতে ছবি তুলতে ব্যস্ত, বাকিরাও নিজেদের মোবাইলে, ক্যামেরা মোডে, সামনে যে ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় রোদ্দুরের খেলা চলছে তখন!

আরিয়ান ওর ব্যাগটা ঘরে রেখে একটা চেয়ার টেনে বারান্দায় বসলো, ‘এখানে বোতল না খুললে এ জায়গার অপমান’

রুক্সার কয়েকটা ছবি তুলে ক্যামেরাটা সযত্নে বিছানার উপর রাখতে রাখতে বললো, ‘যা এনেছিস তিনদিন হবে?’

সৃতমা ওর ট্রলি ব্যাগটা পাশের ঘরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে জানিয়ে দিয়ে গেলো, ‘আরে ওদের লোকাল পাওয়া যায়,দারুন নাকি খেতে’

শিরোনাম আরেকটা চেয়ার টেনে এনে আরিয়ানেরব পাশে বসে বললো, ‘তবে তো বস মারতেই হবে’।

জয়ী ওর ফোন ক্যামেরাতে ছবি তুলতে তুলতে উত্তর দিল, ‘এত সুন্দর দৃশ্য দেখেও তোদের মন এরকম মদ মদ কেনো রে!’

সৃতমা বললো, ‘এটা হেভি দিয়েছিস মন মদ মদ’

আরিয়ান জয়ীর গালে টোকা মেরে বেসুরো গলায় গেয়ে উঠলো, ‘ইয়ে হাসিন বাদিয়া ইয়ে খুলা আসমান আ গায়ে হুম কাঁহা’

মৈনাক এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল, খুব বিরক্তি মেশানো গলায় বললো,

‘please তোর গানটা থামা অসহ্য, আর জয়ী প্লিজ তোর বাংলাটা ঠিক কর’

জয়ী অবাক হয় জিজ্ঞেস করলো,  ‘ভুলটা কোথায়?

রুক্সার ঘরের ভিতর থেকে উত্তর দিল, ‘এটলিস্ট মদিরা বোল ইয়ার, মদ বলিস না, এই surrounding এ ওই ওয়ার্ডটা বেমানান’

মৈনাক ঘরের দিকে ওর গলা তুলে রুক্সারের উদ্দেশ্যে বললো, ‘মদিরা কোনো বাংলা শব্দ নয় রুক্সার’

এর মধ্যে মি.তামাং এসে বললেন, পাশাপাশি এই ঘর দুটো আপনাদের আর এই যে সামনের কটেজেটা, ওটা সামনেই একেবারে খাদের পাশে একটা ছোট্ট কটেজ,ঠিক যেমন ছবিতে আঁকা থাকে তেমনি।

তামাং ওর সাথে আসা ছেলেটিকে চাবি দিয়ে বললো, ‘এ দীপু উস কটেজ খোল দো যাও’

জয়ী, দীপু নামের ছেলেটির পিছন পিছন নেমে যেতে যেতে বলল, ‘ চল কটেজেটা দেখে আসি’

শিরোনাম রেলিং এর উপর পা তুলে বসল, ‘ আমি এখানেই ঠিক আছি তোরা যে যে দেখতে যাবি যা’। 

রুক্সার আর রুপম এগিয়ে গেলো জয়ীর পেছনে।সৃতমা ঘরের ভেতর থেকে আওয়াজ দিল, তোরা যা আমি আসছি’

চলবে…

administrator

Related Articles

1 Comment

Avarage Rating:
  • 0 / 10
  • Molly Ghosh , July 17, 2021 @ 9:56 am

    ভালো লাগছে

Comments are closed.