সতেরো পর্ব

সতেরো পর্ব

জ্যোস্নারাতে

সপ্তপর্ণা বসু

অনুরাগ এগিয়ে যেতেই আরিয়ান বলল, ‘কাকুকে দেখে সিগারেট লুকোচ্ছে, এদিকে মুখে মদের গন্ধ নিয়ে গল্প করছে!’

রুপম বললো, ‘আমরা যথেষ্ট দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আর এই ঠান্ডায় সবাই মদ খায় খোঁজ নিয়ে দেখ উনিও …’

–সে তো সিগারেটও খায়!

–খায়ই তো,   কিন্তু গুরুজনদের সামনে নয়

–শালা গুরুজন মারাচ্ছে! দুটো মেয়ে দেখে…

জয়ী বললো, ‘একজন কিন্তু তোদের থেকে বড় খেয়াল রাখিস’

সৃতমা বললো, ‘তাই,যাহ তাহলে কি মাইনাস ওয়ান হয়ে গেলো!’

রুক্সার বলল, ‘জয়ী বড়-ছোট আবার কি!’

মৈনাক বলল, ‘এক্সজ্যাক্টলি, এসব আবার কি!’

রুপম ইয়ারকি করে গান ধরলো, “না উমর কা সীমা হো/না জনম কা হো বন্ধন…”

সৃতমা বললো, ‘আস্তে, ওরা সামনেই কিন্তু!’

আরিয়ান বললো, ‘চিরকালের ক্যালানে শালা’।

********

কুর্চি কফিতে চুমুক দিয়ে বললো, ‘কফিটা ভালো বাট সন্ধ্যাবেলার চা was better’

অনুরাগ বললো, ‘বললাম না, যেখানকার যেটা ভাষা’

চিনার বললো, ‘চা টা কি ভাষা নাকি!’

অনুরাগ বললো, ‘ভাষাই তো, উত্তরবঙ্গের এই প্রকৃতির ভাষা’

চিনার অদ্ভুত একটা এক্সপ্রেশন দিলো! এখান থেকে ওদের দলটাকে দেখা যাচ্ছে ওই দিকে, খাদের পাশে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। অনুরাগ সেদিকে তাকিয়ে বলল, ‘সময় অনেক এগিয়ে গেছে!’

**********

সৃতমা এগিয়ে যেতে যেতে বললো,

–এই প্রপার্টিটা কিন্তু দারুণ, দুপুরে এই দিকটাতে আসিনি

আরিয়ান বললো, ‘আসবি কখন, এসেই তো শালা হিসি-পটি-স্না…’

রুক্সার বললো, ‘হ্যাঁ, তোর তো আর ওগুলোর দরকার নেই’

শিরোনাম বললো, ‘মহাপুরুষ, বোকা… একটা,শালা সব জয় করে নিয়েছে!’

আরিয়ান বললো, ‘সে আর পারলাম কোথায়!’

জয়ী বললো, ‘এবার থেকে তোর হয়ে হিসি-পট্টিগুলো আমরা করে দিয়ে আসবো’

মৈনাক রেলিং এর ধারে গিয়ে দাঁড়ালো, বিরক্তি মেশানো গলায় বলল, ‘নিস্তব্ধ পাহাড়, জোছনায় ঢাকা উপত্যকা, এসব নিসর্গ ছেড়ে কি সব আলোচনার টপিক!’

সৃতমা বললো, ‘নীরবতা mode এ শিফট করলাম’

কেউ কোনো কথা বলছে না! এ যেন প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের কাছে ওদের নির্বাক হার স্বীকার’

কিছু সময় এভাবেই কেটে গেলো। জয়ী বললো, ‘আমার মাথাটা ব্যথা করছে’

আরিয়ান বললো, ‘এই ঠান্ডায় বাইরে থাকিস না আরো মাথা ধরবে’

রুক্সার বললো, ‘চল, ঠান্ডা আমাদেরও লাগতে পারে’

ধীরে ধীরে কটেজের দিকে হাঁটতে লাগলো ওরা। মৈনাক কিছুটা দূর গিয়ে ওর উদাত্ত গলায় গান গেয়ে উঠলো, “আমারে যে জাগতে হবে/ কি জানি সে আসবে কবে….”

নিস্তব্ধ রাতে সেই গান ভেসে গেলো বাতাসের সাথে

**********

 কুর্চি অনুরাগের হাতটা ধরে বলে উঠলো, ‘বাবা!’

অনুরাগ বললো, ‘শুনছি রে’

চিনার বললো, ‘ ও, এই সেই গান না?’

অনুরাগ কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে বললো, ‘ব্রিলিয়ান্ট।‘

**********

বেশ কিছুটা এগিয়ে এসেছে ওরা, প্রায় কটেজটার কাছে,পিছন থেকে ভেসে এলো, “আমার এ ঘর বহু যতন করে…”

ওদের মামনিকাকু। একই উদাত্ত কণ্ঠে মৈনাকের সুরে সুর মিলিয়েছেন, ওদের একটু পেছনেই।

একে একে সবাই যোগ দিল, সুর মেলাতে শুরু করলো ।পাহাড়ি গ্রামের নির্জনতা ছাপিয়ে শহরে অতিথিদের সেই প্রাণ ভরা নৈবেদ্য  প্রকৃতির শূন্যে কোথায় যে  মিলিয়ে গেলো তার খবর কেউ জানলো না।

**********

স্মৃতি

খুব ঠাণ্ডা বাইরে,অনেকটা জার্নি হয়েছে আজ,তাই আর ওদের সাথে  বেরোলো না নয়না। বিছানায় শুয়ে একটা ম্যাগাজিনের পাতা  ওল্টাচ্ছিল। হঠাৎই অনেক দূরে থেকে গানের সুরটা ভেসে আসছে,  নয়না ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠছিল। সেই গান, সেই উত্তরবঙ্গ,ওদের প্রোগ্রাম,এক এক করে ছবির মতন ভেসে আসতে শুরু করলো ওর চোখের সামনে।  সেই ফরেস্ট বাংলো , জ্যোৎস্না রাত, ছাদে সবাই মিলে গান, হইচই,আড্ডা। হিমাদ্রির সেই উদাত্ত গলার সুর, ” …আমারে যে জাগতে হবে…”

সেই রাতেই ছাদ থেকে নামার সময় হাতে এসেছিল সেই চিরকুটটা,  “নয়না—নয়নে আয়না যার, সেখানেই নিজেকে দেখি, প্রতিদিন, বারবার।”

তারপর অনেকদিন হিমাদ্রির চোখের দিকে তাকাতে পারে নি নয়না।

administrator

Related Articles