সতেরো পর্ব

সতেরো পর্ব

সপ্তপর্ণা বসু

ঘর ভাগ

ছোট্ট কটেজ, সামনে বেড়া দিয়ে একটা বসার জায়গা মতন করা, নিচে তাকালেই বিশাল খাদ আর দূরে দূরে কয়েকটা ছোট ছোট বাড়ি আর জংলা সবুজের বাহার, আর চোখের সোজাসুজি সীমানায় পাহাড়ের সারি, তার উপরে নীল আকাশের মাঝে মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাঞ্চনজঙ্ঘা।

দীপু ঘর খুলতে খুলতে ওরা সামনে রাখা লম্বা বেঞ্চটাতে গিয়ে বসলো

দীপু বললো, ‘ভাইয়া আইয়ে’

রুপম কটেজে ঢুকে পিঠ থেকে ওর ব্যাগটা নামিয়ে বললো, ‘এটায় আমায় থাকতে দিবি?’

রুকসার বললো, ‘দিবি মানে টা কি! কে দেবে!তোর ইচ্ছা হলে তুই থাক!’

রুপম ইচ্ছা করে রুকসারকে রাগিয়ে দেবার জন্য বললো, ‘ladies first না ইয়ার’

রুকসারও সেরকম, বললো, ‘না রে দেবো না, এটায়  আমি থাকবো আর আমার রুম পার্টনার হিসাবে আমি তোকে একটুও চাই না’।

রুপম হাত জোর করে হাঁটু মুড়ে রুক্সারের সামনে বসে পড়লো, ‘ভাই প্লিজ প্লিজ প্লিজ এটায় আমায় থাকতে দে ভাই, তোর আমাকে পছন্দ না হলে আপত্তি নেই but আমাকে এই রুমটা দে, প্লিজ’।

সৃতামা কটেজে ঢুকে ব্যাপারটা অনুধাবন করে বললো, ‘রুক্সার এই কটেজেটা তে তুই আর আমি’

রুপম কপট অভিমান করে ওর ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে বেরিয়ে যাবে বলে উঠে দাঁড়াতেই রুকসার ওর কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে বললো, ‘ন্যাকা’।

ইতিমধ্যে মৈনাকও এসে গেছে, ‘আরিববাস এই কটেজেটা তো জাস্ট ফাটাফাটি

সৃতামা বললো, ‘হুম, তাই মেঘ পিয়নের ভাগে বরাদ্দ হয়েছে’

মৈনাক বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পরলো, ‘আমি ভাই মেঘ পিয়নের পার্টনার, ওর ব্যাগ বয়ে দেবো’।

রুপম বললো, ‘ done’

রুক্সার বললো, ‘তোরা ফ্রেশ হয়ে নে তাড়াতাড়ি হেভী খিদে পেয়েছে রে’

সৃতমা যোগ করলো, ‘স্টেশনে খুব বাজে ব্রেকফাস্ট হয়েছে, চল বলি গিয়ে ওনাদের তাড়াতাড়ি লাঞ্চ দিতে’

রুপম বললো, ‘ভাই আমি রেডিই আছি কোথায় যেতে হবে বল’

সৃতমা আদেশের সুরেই বললো, ‘ওই সারারাত ট্রেন জার্নি করেছিস, জামা কাপড়টা অন্তত চেঞ্জ কর’

রুপম সৃতমার হাতটা ধরে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো, ‘তুই বললে আমি সব করতে পারি’

মৈনাক বিছানা থেকে উঠে পড়লো, ‘আরে নাহ্, ডায়লগ ভাই ডায়লগ

রুক্সার বললো, ‘তোর ওই ডায়লগবাজি রাখ’

ওরা বেরিয়ে যেতে গেলো, রুপম চেঁচিয়ে বলে উঠলো, ‘সৃতমা আমার গিটারটা ওখানে আছে ওটা আমার জান ভাই, তোর কাছে রাখিস’

রুক্সার সেরকমই চেঁচিয়ে বললো, ‘আবার ডায়লগ!’

রুপম ঘর থেকে বেরিয়ে খাদের দিকে এগিয়ে গেলো,পাহাড়ের দিকে দুটো হাত বাড়িয়ে বললো, ‘হাত বাড়ালেই কাঞ্চনজঙ্ঘা শালা ভাবা যায়!’

মৈনাক এসে খাদের একেবারে ধারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, ওখান থেকে উদাত্ত গলায় গান গেয়ে উঠলো, ‘দেহ মনের সুদূর পারে হারিয়ে ফেলি আপনারে..’  রুপমও যোগ দিলো।

***

লম্বা বারান্দাটায় বসে আরিয়ান সিগারেট খাচ্ছিল, ওদের গানের আওয়াজ কানে আসতেই শিরোনামের দিকে তাকিয়ে বললো, মাড়িয়েছে, ওই দুটো রবীন্দ্রসঙ্গীত ধরেছে’

শিরোনাম বললো, ‘ওই মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট দুটোকে ওই কটেজে চালান করে দে,  শালারা যত খুশি গান গাক’

সৃতমা আর রুক্সারকে ফিরে আসতে দেখে শিরোনাম বললো, ‘ও দুটোকে শালা রবীন্দ্র সংগীতে পেয়েছে’

সৃতমা বললো, ‘তোদের রবীন্দ্র সংগীতে এত এলার্জি কেনো রে!

রুক্সার বললো, ‘শিরোনাম! তুই কাকে কি বলছিস! সৃতমা স্কুলে রবীন্দ্রসঙ্গীত চাম্পিওন সেটা তুই ভুলে গেলি!’

– ওহ ইয়েস ইয়েস, I just forgot। দুটো হাত জোর করে নমস্কারের ভঙ্গিতে সৃতমার সামনে দাঁড়িয়ে উঠলো, ‘আমায় ক্ষমা করে দে ভাই’

জয়ী অবাক হয়ে বললো, ‘সৃতামা আর রবীন্দ্র সংগীত!unbelievable! কলেজ তো সবসময় ইংলিশ আর হিন্দি গানই শুনি, not even a bengali gaan!’

আরিয়ান বললো, ‘ ওহ, তোরা তিনজন তো আবার একই স্কুল’

শিরোনাম আরিয়ানের হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে টান দিতে দিতে বললো, ‘চারজন, রুপমও।তবে সৃতমা তো রুপমের মতো গানে সব সময় বুলেট ভরে গুলি চালায় না তাই ভুলে যাই’

ওদিক থেকে গানের আওয়াজ আরো জোরালো হতে থাকলো- “এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলো….”

***

পাশের কটেজে সকাল

এত কাছ থেকে এরকম পরিষ্কার কাঞ্চনজঙ্ঘা এর আগে কখনো দেখিনি নয়না, উত্তরবঙ্গ বা সিকিমের অনেক জায়গাতেই বেরিয়েছে ও, কিন্তু এ যেনো একেবারে হাতের মুঠোয়!

অনুরাগ মেয়েদের ডাকতে ওপরে গেছে। নয়নার ছোটবেলায় দার্জিলিং-এ এসে টাইগার হিল দেখতে যাবার কথা মনে পড়ে গেলো, খুব রাগ হয়েছিল বাবার উপর, ওই ঠান্ডায় সকাল সকাল তুলে দেবার জন্য,তখন অবশ্য ও চিনারের থেকে অনেকটাই ছোট ছিল নয়না। ওপরে অনুরাগের গলা শুনতে পাচ্ছে, সমানে ডেকে চলেছে মেয়েদের।নয়না নীচ থেকে বললো, ‘ছেড়ে দাও,যখন উঠবে তখন দেখবে’

অনুরাগ ওপর থেকেই উত্তর দিলো, ‘এটা পাহাড়, এই রোদ তো এই বৃষ্টি,এত সুন্দর ঝলমলে…’ বলতে বলতেই দরজা খোলার আওয়াজ।

অনুরাগ বা নয়না আজকাল কোথাও গিয়ে খুব একটা একটা ঘোরাঘুরি করে না, আগে যেমন লম্বা লম্বা ট্যুর হতো, দশ-বার দিনের, সেরকম তো হয়ই না, কুর্চি অফিস থেকে কয়েকটা দিন মাত্র ছুটি নিয়ে আসে, চিনারের ও পড়ার চাপ, আজ স্কুলে তো কাল কোচিং-এ পরীক্ষা, তার মধ্যে কোনোরকম এই  সময় বার করা।

আজ ওদের ঋষিখোলা বলে একটা জায়গা দেখতে যাবার কথা। মি.তামাংই বললেন,

–ঘুরে আসুন না দাদা ভালো লাগবে,বেশি দূর নয়

মেয়েরাও উৎসাহ দেখালো, বেশিক্ষনের পথ নয় শুনে নয়নাও রাজি হয়ে গেল।

তামাংদের এখানে গাড়িরও ব্যবস্থা আছে তাই সব ঠিক হয়ে গেল সহজেই। নয়নার আজকাল বেশিক্ষন গাড়িতে বসতে কষ্ট হয়, হাঁটুতে একটা ব্যথা অনুভব হয়, নিজেকে মনে মনে খুব শক্ত করলো নয়না, ‘কি এমন একটা বয়স যে এই বয়সেই হাঁটু ব্যথা হবে!বাড়ি থেকে না বেরিয়ে বেরিয়ে এই রোগটা হচ্ছে। এবার চিনার কলেজ ভর্তি হলেই একটা কিছু করতে হবে, এভাবে বসে থাকতে সারাদিন একলা একলা আর ভালো লাগে না। কি করতে পারে ও! সেকথা ভাবতে গেলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছেলেবেলা, হারমোনিয়াম নিয়ে রেওয়াজ, পাড়ার গানের স্কুল থেকে  বালিগঞ্জ এর সেই গানের স্কুলের ঘরটা,  কত জায়গায় প্রোগ্রামে যেত,কলকাতা, শহরতলী, তারও বাইরে, একবার এই ডুয়ার্স… না আর এসব ভাববে না, কতকাল এই অধ্যায়টা বন্ধ খামের মধ্যে রাখা রয়েছে,থাক যেমন আছে তেমনি। নীচে নেমে চিনার এসে মায়ের কোলে মাথাটা দিয়ে শুয়ে পড়ার ভঙ্গিতে বললো, ‘এত সকালে কেনো বেরোনোর প্রোগ্রাম করো তোমরা, একটু বেলায় করলে কি হয়!’

নয়না বললো, ‘ কিরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখেছিস?

চিনার চোখ বন্ধ করেই ঘুমের আবেশ মেশানো গলায় বললো, ‘হুম’।

ক্রমশ…

administrator

Related Articles