অমলাদিদি

অমলাদিদি

সপ্তপর্ণা বসু

আর পাঁচটা সাধারণ বাঙালি মেয়ের মতন তার চেহারা ছিল না। অনেকটা লম্বা, বেশ সুগঠিত শরীর, দেখে মনে হতো খুব রাশভারী বুঝি, কিন্তু গলার স্বরের মধুরতা সে ভুল ভাঙিয়ে দিত। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে ছিল তাঁর অবাধ আনাগোনা। রবিঠাকুরের পত্নী মৃণালিনী দেবীর অনুরোধে প্রায়ই সেখানে থাকতেন। মৃণালিনীকে ডাকতেন ‘কাকিমা’ বলে। কিন্তু দুজনের মধ্যে ছিল অগাধ সখ্যতা।ক্রমে ঠাকুর পরিবারেরই একজন হয়ে উঠেছিলেন। বাড়ির ছেলেমেয়েরা তাকে ডাকতো, ‘অমলাদিদি’ বলে। এই ‘অমলাদিদি’ ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বোন অমলা দাশ। তাঁর গানের গলায় মুগ্ধ হয়ে রবিঠাকুর তাঁকে রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামীর কাছে গান শিখতে পাঠিয়েছিলন। রাধিকাপ্রসাদ ছিলেন বিষ্ণুপুর ঘটনার একজন বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী।

ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গীতাচার্য পদে তাঁকে আহ্বান করেছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর।রবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ-এর ভাষায়, “অল্প দিনে ওস্তাদি অনেক গান শিখে নিলেন। অমলা দিদির গলা যেমন অনায়াসে খাদে খেলত তেমনি চড়াতে উঠতো”। তাঁর গলার এই বৈশিষ্ট্য মাথায় রেখেই রবিঠাকুর রচনা করেছিলেন বেশ কিছু গান,  ‘চিরসখা, ছেড়ো না মোরে ছেড়ো না’, ‘কে বসিল আজি হৃদয়াসনে’, ‘এ কী আকুলতা ভুবনে’, ‘এ পরবাসে রবে কে’,  এই গানটিও অমলাদেবী গাইবেন বলেই লেখা হয়েছিল সে কথা রথীন্দ্রনাথের লেখা থেকেই জানা যায়।

‘দিন ফুরালো হে সংসারি’ গানটি অমলা দাশ ছাড়া আর কেউ জানতেন না। অমলাদেবী এই গানের রাগপ্রধান সুরটি কণ্ঠে তুলেছিলেন কোনও এক বিয়েবাড়ির নহবত শুনে। রবীন্দ্রনাথ আমলার গলায় এই সুর শুনে মুগ্ধ হয়ে তাতে কথা বসিয়ে দেন। অমলাদেবীর কাছ থেকে এই গানটি শিখেছিলেন তার বোনঝি সাহানাদেবী, বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী, পরে ১৯২৩-এর এক মাঘোৎসবে কবি যখন সাহানাদেবীকে দিয়ে বিসর্জন নাটকের গান গাওয়াবেন ঠিক করেন তখন তিনি জানতে পারেন যে, ‘এই দিন ফুরালো হে সংসারি’ গানটি সাহানাদেবীর জানা। তিনি খুবই উৎফুল্লিত হন। সাহানাদেবীর ভাষায়— “মাসিমার কাছে আমি আমি এই গানটি শিখেছিলাম শুনে খুবই খুবই উৎফুল্ল ও আশ্বস্তও হলেন। কেননা ওঁর ধারণা হয়েছিল মাসিমার মৃত্যুর সঙ্গে ওঁর এই গানটিও হয়তোবা লুপ্ত হয়ে গিয়ে থাকবে। তাই আমার কন্ঠে গানটি শুনেই তখুনি স্থির করে ফেললেন গানটি আমাকে দিয়ে ‘বিসর্জন’ এ গাওয়াতেই হবে”।

১৯০৪ সাল থেকে রবি ঠাকুরের গান রেকর্ড হতে শুরু করে কিন্তু সে সব গানে আসল স্বরলিপি মানা হতো না, এমনকি গানের কথারও পরিবর্তন করা হতো, রবীন্দ্রনাথ সে সবের খবর রাখতেন কিনা তা জানা নেই তবে সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে এসে গ্রামোফোন কোম্পানিতে  গান রেকর্ড করা প্রথম মহিলা শিল্পী ছিলেন অমলা দাশ। রেকর্ড-এর গায়ে লেখা থাকতো ‘AKA Miss Das, Amateur’। তাঁর রেকর্ড করা গানই ছিল প্রথম নির্ভরযোগ্য রবীন্দ্রসঙ্গীত যেটিকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ অনুমোদন করেন। ১৯১০সালে অমলা দাশের গাওয়া ‘ চির সখা হে….’  রেকর্ড হয়ে জনগণের কাছে এসে পৌঁছয়। সাধারণ মানুষের কাছে সেইদিন থেকে খুলে যায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুভবের অঙ্গন।

শিলাইদহে শীত পড়লে পদ্মায় জেগে উঠতো বালির চর। তখন রবিঠাকুর সবাইকে নিয়ে গিয়ে থাকতেন সেখানে, দুটি বড় বড় ঢাকাই বজরায়। পানসী, লালডিঙ্গি, জলিবোট এরকম নানা ধরনের নৌকা বাঁধা থাকতো ঘাটে। রথীন্দ্রনাথ লিখছেন, “লেখার ফাঁকে ফাঁকে যখন বাবাকে গানে পেয়ে বসতো অমলাদিদিকে কলকাতা থেকে নিয়ে আসতেন”। অমলা দাশের রান্নার হাতটিও বেশ ভালো ছিল। তিনি মৃনালিনি দেবীকে নানা রকম ঢাকাই রান্না শেখাতেন আর তিনি তাঁর কাকিমার কাছ থেকে শিখে নিতেন যশোর অঞ্চলের নিরামিষ রান্না। ইন্দিরাদেবীকে লেখা একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “কাল অনেক কাল রাত পর্যন্ত ঘুম হয়নি অনেকক্ষণ জলিবটে পড়েছিলুম, তার পরে আমার শোবার ঘরে এসে জানলার ধারে বেঞ্চিতে বসে অনেকদিন পরে একাকী যাপন করেছিলুম।… রাত্রি যদিও গভীর ছিল কিন্তু সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ ছিল না, কারণ, আমার পাশের বোট থেকে আমার প্রতিবেশিনী বিছানায় পড়ে পড়ে হাস্যালাপ করছিলেন। তাঁদের সেই সখ্যতার সাক্ষী হয়ে রইলো রবি ঠাকুরের গান, তিনি লিখেলেন ‘ওলো সই ওলো সই’।

শিলাইদহে প্রায়ই অনেক অতিথি আসতেন।রাতের খাবার পর সবাই মিলে গান শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতেন। অসম্ভব এক সুন্দর বর্ণনায় রথীন্দ্রনাথ তাঁদের সেই সুখস্মৃতিকে তুলে ধরেছেন, “মাঝিরা জলিবোটটা বজরার গায়ে বেঁধে দিয়ে যেত। তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে জানলা দিয়ে টপকে সেই বোটটাতে গিয়ে বসতুম। সুরেনদাদার হাতে এসরাজ থাকত।জলিবোট খুলে মাঝ দরিয়ায় নিয়ে গিয়ে নোঙর ফেলে রাখা হত। তারপর শুরু হতো গান— পালা করে বাবা ও অমলা দিদি গানের পর গান গাইতে থাকতেন। আকাশের সীমান্ত পর্যন্ত অবারিত জলরাশি, গানের সুরগুলি তার ওপর দিয়ে ঢেউ খেলিয়ে গিয়ে কোন সুদূরে যেন মিলিয়ে যেত, আবার ওপারের গাছপালার ধাক্কা খেয়ে তার মৃদু প্রতিধ্বনি আমাদের কাছে ফিরে আসত। ক্রমে রাত্রি গভীর হলে চারদিক নিঝুম হয়ে আসতো।নৌকা চলাচল তখন বন্ধ। বোটের গায়ে থেকে থেকে ঢেউগুলি এসে লাগছে এবং কুলুকুলু শব্দ করে স্রোতের সঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছে। চাঁদের আলো পড়ে নদীর জল কোথাও কোথাও ঝিকিমিকি করে ওঠে।কখনো দু-একটা জেলেডিঙিতে মাঝিরা ভাটিয়ালি সুরে দাঁড় ফেলার তালে তালে গান গাইতে গাইতে চলে যায়।গানের আসর ভাঙবার আগেই আমি মা’র কোলে ঘুমিয়ে পড়তুম।সে-সব রাত আজ স্বপ্নের মতো মনে হয়, কিন্তু আজও যখন ‘বেলা গেল তোমার পথ চেয়ে’, ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা তুমি আমার সাধের সাধনা’ প্রভৃতি গান শুনি, সেই সব রাত্রির কথা মনে পড়ে যায়, যে রাত্রে গানের সুর জলের কলধ্বনি ও ফুরফুরে দক্ষিণের হাওয়ার সঙ্গে এক হয়ে যেত, যে রাত্রে চাঁদের আলোর বন্যায় নদীর জলে ও নদীর চরে অপূর্ব এক ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করত”।

administrator

Related Articles