মিষ্টি কথাঃ সাদা বোঁদে

মিষ্টি কথাঃ সাদা বোঁদে

বৈঠকখানা ডেস্কঃ “যদি, কুমড়োর মত, চালে ধ’রে র’ত ,/ পান্‌‌তোয়া শত শত; / আর, সরষের মত, হ’ত মিহিদানা / বুঁদিয়া বুটের মতো…” রজনীকান্ত সেন তাঁর কল্যাণী কাব্যগ্রন্থের ঔদারিক গানে বাংলার বিভিন্ন প্রকার মিষ্টান্নের উল্লেখ করেছেন। সেখানে বোঁদের উল্লেখ পাওয়া যায়।

বোঁদে’ কথাটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘বিন্দুক’ থেকে। মনে হয় বোঁদে ভারতের অন্যতম প্রাচীন মিষ্টান্ন। প্রাচীন সাহিত্যে এর উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বিরিকলাই গুঁড়ো, চিনি ও ঘি সহযোগে এই মিষ্টান্ন তৈরির করা কথা বলা হয়েছে।

বাংলায় বোঁদে হয় তিন রকম। হলুদ বোঁদে, লাল বোঁদে ও সাদা বোঁদে। তবে সাদা বোঁদে বাংলা ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না। অবশ্য রঙ আলাদা হলেও স্বাদের খুব একটা তারতম্য নেই লাল বা হলুদ বোঁদের। কিন্তু সাদা বোঁদের স্বাদ আলাদা। তবে সাদা বোঁদে পুষ্টিকরও বটে। কেননা এতে থাকে বরবটির বেসন।

চাল গুঁড়ো ও বেসন মিশিয়ে তাতে জল দিয়ে একটি থকথকে তরল মিশ্রণ প্রস্তুত করা হয়। চালুনির মধ্য দিয়ে বিন্দু বিন্দু তরল মিশ্রণ কড়াইয়ে ফুটন্ত ঘি বা তেলে ছাড়া হয়। ঘিয়ে কড়া করে ভেজে গোলকৃতি দানাগুলি সামান্য জাফরান মেশানো চিনির রসে রাখা হয়।ঘিয়ে ভাজা বোঁদে জাফরান মেশানো চিনির রসে ডোবালে লালচে হয়। আবার ঘিয়ে না ভেজে তেলে ভাজলেও লালচে হয়।

হুগলি জেলার জনাই ও কামারপুকুর-জয়রামবাটীর সাদা বোঁদে বিখ্যাত। জনাইয়ের বড়ো বোঁদে পটল আকৃতির হয়, কিন্তু কামারপুকুর-জয়রামবাটীর সাদা বোঁদে গোল আকৃতির হয়।জয়রামবাটীর সাদা বোঁদের মূল উপাদান বরবটি দানার গুঁড়ো বা বরবটি বেসন, আতপ চাল ও গাওয়া ঘি। বরবটি বেসন ও আতপ চালের গুঁড়ো ১:২ অনুপাতে মিশিয়ে সারা রাত ভিজিয়ে রাখতে হয়। পরের দিন সেই মিশ্রণকে চালুনির ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে কড়াইয়ে ফুটন্ত গাওয়া ঘিতে ফেলা হয়। ভাজা হলে চিনির রসে ডুবিয়ে রাখা হয়।

বহুকাল আগে কামারপুকুরে সাদা বোঁদে তৈরি করতেন হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার। তারপর কামারপূকুরে সাদা বোঁদে তৈরি করেন মধুসূদন মোদক।গদাধর চট্টোপাধ্যায়, যিনি পরবর্তীকালে রামকৃষ্ণ পরমহংস বা ঠাকুর বলে খ্যাত হন, তাঁর অতি প্রিয় ছিল মধুসূদন মোদকের সাদা বোঁদে।সারদা দেবীরও সাদা বোঁদে ভীষণ প্রিয় ছিল। তিনি দুর্গাদাস মোদকের পুত্র সত্যকিঙ্কর মোদকের দোকানের বোঁদে খুব ভালবাসতেন। তিনি ভক্তদের সাদা বোঁদে বা জিলিপি খেতে দিতেন। সেই থেকেই কামারপুকুরের সাদা বোঁদের সাথে মোদক পরিবারের নাম জড়িয়ে আছে।

কামারপুকুর তীর্থস্থানে পরিণত হলে সাদা বোঁদের জনপ্রিয়তা দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে।বর্তমানে সাদা বোঁদের সুনাম ও চার পুরুষ ধরে জেলার মিষ্টির জগৎকে ধরে রেখেছেন কুঞ্জবিহারী, ক্ষুদিরাম, সত্যচরণ এবং বর্তমান প্রজন্মের ভোলানাথ পাল। আদি গ্রাম বাঁকুড়ার দেশড়ায় মিষ্টি তৈরি করে ঝাঁকায় করে জয়রামবাটিতে এনে বিক্রি করতেন কুঞ্জবিহারী। কামারপুকুরে মিষ্টির দোকানের সংখ্যা মোট কুড়ি বাইশটি। দোকানগুলি মঠ চত্বর, লাহা বাজার ও কামারপুকুর চটি এই তিনটি অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে। প্রতিটি মিষ্টির দোকানেই এই সাদা বোঁদে পাওয়া যায়।

২০১৭ সালে রসগোল্লা জি আই স্বীকৃতি পাওয়ার পর কামারপুকুরের সাদা বোঁদের জি আই স্বীকৃতির দাবী ওঠে। কামারপুকুরের মানুষ কামারপুকুরের ঐতিহ্যবাহী সাদা বোঁদের জি আই স্বীকৃতি দাবী করেন। কামারপুকুরের মিষ্টান্ন ব্যবসায়ীদের দাবী কামারপুকুরের জলের গুণের বোঁদের রঙ সাদা হয়। কামারপুকুরের এই জল অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না, তাই কামারপুকুরের সাদা বোঁদের জি আই স্বীকৃতির দাবী যুক্তিযুক্ত।

administrator

Related Articles