তালিবান আর মোহরের স্টেগোসোরাস

তালিবান আর মোহরের স্টেগোসোরাস

দীপঙ্কর দাশগুপ্ত

কিছুদিন ধরেই মোহ-কে নিয়ে লেখার কথা ভাবছিলাম। মোহ-এর আসল নাম মোহর। তার একটা ভালো নামও আছে, শৌরসেনী। সেই যে আমার লিটল প্রিন্সেস। তিন বছরের মোহর, যার একটা স্টেগোসোরাস আছে। বড়রা মনে করে ওটা খেলনা, মোহরের কিন্তু তার সঙ্গে নিয়মিত কথা হয়। নামটা অবশ্য মোহরের উচ্চারণে ‘টেগোছরাছ’ হয়ে গেছে।

তো সেদিন আবার নাকি সেই টেগোছরাছ মোহরকে বলেছিল, ‘‘মোহর তোকে আমি খাব।’’ গতবারে মোহর মায়া করে ওকে মারতে পারেনি, কিন্তু এবারে নাকি ‘ছুরি দিয়ে খুন’ করে ফেলেছিল। ‘ছুরি’, ‘খুন’ এসব শুনে মোহরের মায়ের আত্মারাম খাঁচাছাড়া। মোহরকে ওর মা জিজ্ঞেস করে, ‘‘ছুরি? ছুরি তুই কোথা থেকে পেলি, এ ঘরে তো কোনও ছুরি নেই!’’ মোহর উল্টে ওর মাকে বলেছিল, ‘‘আছে একটা। তুমি জানো না।’’ কাল্পনিক সেই ছুরির কথা মোহরের মায়ের জানারও কথা নয়। মোহর ঠিকই বলেছে।

জিজ্ঞেস করলাম— কিন্তু মোহর, ছুরি দিয়ে তুমি একেবারে খুনই করে দিলে। তারপর কী হল? ‘‘তারপর টেগোছরাছ কানতে লাগল। বলল, অ্যাঁ…অ্যাঁ মোহর তুমি আমায় মাল্লে?’’ ওর মা রেগে যায়। বলে, ভাবো তো কাণ্ডটা? খুন হওয়ার পরে কান্না! এমন বানাতে পারে মেয়েটা।’’

আমি ওর মায়ের কথায় পাত্তা দিই না। বস্তুত এই আইডিয়া আমার নিজেরই খুব মনে ধরেছে। কাঁদার পর কাউকে খুন করার চেয়ে অনেক ভাল। তাছাড়া মোহরকে অত ঘন ঘন থামিয়ে দিলে ওর গল্প বলা বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তাড়াতাড়ি বললাম, ‘‘তারপর কী হল মোহর? টেগোছরাছ তো কানতে লাগল। তারপর তুমি কী করলে?’’ মোহরের তৎক্ষণাৎ জবাব, ‘‘আমি টেগোছরাছটাকে ব্যান্ডেজ করে দিলাম। ব্যস।’’

সেই থেকে ঠিক করেছি, যদি খুন হতেই হয়, মোহরের হাতেই খুন হব। তাতে আর কিছু নয়, কাঁদলেই জীবন ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। বড়রা সে সুযোগ দেবে না। তাদের ওতে বিশ্বাস নেই। এই আফগানিস্তানে এখন যেমন চলছে। ওখানেও মোহররা আছে, তাদের টেগোছরাছগুলোও আছে। কিন্তু ওদের স্বপ্নমাখা গল্পগুলো হঠাৎ থমকে গেছে।

চোখ বুঁজে এই সব সাত-পাঁচ ভাবছি, এমন সময় শুনি খ্যাকখ্যাক হাসি। মোহরের টেগোছরাছটা হাসছে আর বলছে— ‘‘রিপোর্টার মশাই! হোরেশিও হায়! দুনিয়ায় কত কী ঘটে, তুমি কী জানো? তুমি তো মিলান কুন্দেরার ‘বুক অব লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’ও পড়নি।’’ পাশে বসে মোহরও হাসছে। ওর সেই জলে আছি-জলে নেই মার্কা ভুবনভোলানো হাসি।

বড় হয়ে মানুষ যে এত হোঁৎকা হয়ে যায় কেন? মোহরের আগে এ কথা একমাত্র বুঝেছিলেন সুকুমার রায়।

administrator

Related Articles