যখন অন্ধকার আসে

যখন অন্ধকার আসে

অনসূয়া মুখার্জি

সম্পাদক মশাই বলে পাঠিয়েছেন রবিবার সকালেই যেন গল্পটা ওনার টেবিলে জমা পড়ে। কতবার বলেছি আমায় সময় বেঁধে অর্ডারি লেখা দেবেন না… সে ব্যাটা শুনলে ত। বলে কিনা আমার নাম থাকলেই কাটতি বেশি। পুরোটা যে তেল দেওয়া তা বলতে পারি না। এখনো সূচীপত্রতে আমার নামটা কচি কাঁচাদের টানে বৈকি। কিন্তু মুশকিল হলো আমি আবার পুরো মিথ্যে লিখতে পারি না। মানে শুরুটা আমাকে সত্যি দিয়েই শুরু করতে হবে। কে যে মাথার দিব্যি দিয়েছে! নিজেকে শুধাই সত্যি কথা লিখবো কেন? আবার নিজেই ভাবতে বসি পুরো মিথ্যে নিয়েই বা বাঁচব কেন?

চারটে সিগারেট শেষ। ডিনারের পর এককাপ কফিও। না ঘুম, না লেখা কিছুই আসছে না।

আজ শুক্রবার রাত হিসেব করে দেখলে আর আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে আমাকে লেখা সহ তেনাদের ডেরায় পৌঁছে দিতে হবে। কি যে করি!

– “অত ভেবে কি হবে আমাকে নিয়েও ত একটা লেখা হতে পারে? “

আমি চমকে বিষম খেয়ে যাই যাই অবস্থা।

-“তুমি মানে আপনি কে? “

– “আমি আগে ছিলাম স্টোনম্যান এখন, থাক এখনটা তোমার না জানলেও চলবে।”

-“স্টোন ম্যান মানে তুমি পাথরের ব্যবসা কর! কিন্তু আমার ত পাথরের কাজ নেই।”

-“দূর ছাই, জ্বালালে দেখছি! “লোকটা বলল না স্টোনম্যান মানে যে রাতের অন্ধকারে ধারালো পাথর দিয়ে ফুটপাথবাসীদের খুন করে।”

-“খু উ উ উ উউ ন!”

– আমি চেঁচাতে থাকি আর লোকটা আমাকে জাপটে ধরে চেয়ারে বসিয়ে সাদা কাগজ আর পেন ধরিয়ে বলল “যা বলছি লিখতে থাকো। তোমায় খুন করা হচ্ছে না।”

-“হ্যাঁ যা বলছিলাম আমি স্টোনম্যান মানে স্টোন মানে ভারী পাথর দিয়ে ফুটপাথে ঘুমন্ত মানুষের মাথা ফাটিয়ে মেরে ফেলি। এজন্য আমি পয়সা পাই।…

একগ্লাস জল দাও তো।”

লোকটা এক নি:শ্বাসে বলে গেল ততোধিক দ্রুতগতি তে আমি লিখে গেলাম। লোকটাকে একগ্লাস জল খাইয়ে আমি জানতে চাইলাম…

-“কে পয়সা দেয়? “

-“কমিটি”

-“কি? “

-“হ্যাঁ কমিটি।” লোকটা জোর গলায় বলল।

-“এই তিলোত্তমা শহরের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার এক কমিটি আছে। তারা শহরকে সুন্দর বিন্যস্ত রাখতে চায়। আর কে না জানে ফুটপাতে থাকা লোকজন শহরটাকে নোংরা করে রাখতে ওস্তাদ। কিন্তু প্রথমে গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করতে হয়। যে লোকগুলোর কেউ নেই সেগুলোকে আইডেন্টিটিফাই করা হয় মানে সে মারা গেলে তার বৌ বাচ্চা ভাই ঝামেলা করবে না… “

-“তাতে ফুটপাথের সব লোক নিকেশ হয়েছে? “

-” মানুষ বাঁচতে খুব ভালোবাসে। তাই মৃত্যু ভয় সবচেয়ে বড় ভয়। একজনকে বিশ্রী ভাবে মেরে আরো অনেকগুলো পরিবারকে আমাদের টিম শহরের  ফুটপাত থেকে শহরতলীর স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম নিয়ে ফেলে। শুধুমাত্র আতঙ্কহীন বেঁচে থাকবে এই আশায়… “

আমি লিখে চলছিলাম আর ভাবছিলাম এটা কোনও পাগলের কান্ড কারখানা নয়!অথচ আমি আমরা সব্বাই এটাকে নিছক বিচ্ছিন্ন পাগলামো বলেই ধরে নিয়েছি।

-“মানুষ দারিদ্রসীমার কোন নীচে নামলে ফুটপাতে এসে আশ্রয় নেয় তা কেউ বুঝতে চায় না!” লোকটার গলায় হতাশার সুর আমি বুঝতে পারি। লোকটা কি কাঁদছে?

– “বেশ, বুঝলাম তাতে লাভ কি হলো?  আমি জানতে চাই।

– “আমার লাভ পয়সায় তোমার লাভ নেই আর আমাদের কমিটির যে লাভ হয় সেটা তুমি বা আমি বুঝবো না।”

আমি বুঝলাম স্টোনম্যান তার নৃশংসভাবে মানুষ খুন… পত্রিকার প্রথম পাতা জুড়ে নানা দিক থেকে ফটো আর আলাপের বিলাপের খবরে আমি ভুলে গিয়েছি পটল আর ঝিঙে ১০০ টাকা কিলো চালকুমড়ো ৮০ টাকা

আলু আর আলু আর আলুই খাচ্ছি অনেকদিন ধরে।

আমার শহর পরিশোধন হচ্ছে…

আমি পরিশোধন হচ্ছি…

কিসের বিনিময়ে?

***

দরজা দিয়ে রোদ চোখে মুখে আসতেই ধড়মড় করে উঠলাম। চোখ খুলে বুঝলাম স্বপ্ন দেখছিলাম।

যাক বাবা! 

টেবিলের উপর কাগজ পেন রয়েছে কিন্তু সাদা।

administrator

Related Articles